লেন্সোইসের দিকে যাত্রা মানে স্বপ্নের ভেতরে পা রাখা। অনভিজ্ঞ চোখ প্রথমবার যখন বালিয়াড়ির ফাঁকে নীল লেগুন (স্বচ্ছ ছোট জলাধার) আবিষ্কার করে, মনে হতে পারে যেন চোখ ভুল করছে। প্রজাপতির পাখার রঙের মতো গভীর নীল, কখনো কাঁচের মতো স্বচ্ছ, কখনো আবার সবুজাভ ছায়া—হাজারো লেগুনের এই রূপ সত্যিই অন্য কোনো গ্রহের দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়।

এই লেগুনগুলো কিন্তু স্থায়ী নয়। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে বালির নিচের শক্ত পাথরস্তরে পানি জমে তৈরি হয় এই মিষ্টি পানির পুকুরগুলো। এগুলোর সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে জুলাই-আগস্টে।

বালির এই রাজ্যকে অনেকে ভুল করে মরুভূমি ভাবেন। কিন্তু লেন্সোইস আসলে মনুষ্যহীন বৃষ্টি–ভূমি। পার্নাইবা ও প্রেগুইসাস—দুটি নদীর পলিমাটি সমুদ্র থেকে ফিরে তীব্র বাতাসে ভেসে আসে এই অঞ্চলে। বৃষ্টি এসে সেই পলির ওপর বালি জমিয়ে তৈরি করে ঢেউতোলা ডুনস। আর তার ফাঁকে জন্ম নেয় নীলাভ লেগুন।

braz2

ছবি— সিএনএন

লেন্সোইসে যাওয়ার পথ মোটেও সহজ নয়। আর এ কারণেই এখানে ভিড় কম থাকে। প্রথমে পৌঁছাতে হয় মারানহাওয়ের রাজধানী সাও লুইসে। সেখান থেকে পাঁচ ঘণ্টার বাসযাত্রায় বারেইরিনহাস—পার্কের প্রধান প্রবেশপথ। আরো নিরিবিলি পথ হলো সান্তো আমারো। আবার চাইলে সিয়ারার জেরিকোয়াকোয়ারা থেকে বগি আর স্থানীয় পরিবহন মিলিয়ে রোমাঞ্চকর উপকূল–পথেও পৌঁছানো যায়।

যে পথেই যান, পুরস্কার একটাই—অসীম নির্জনতা। বিশাল বালিয়াড়ির সমুদ্রে আপনি আর প্রকৃতি—এর বাইরে কেউ নেই। লেগুনের তীরের নরম বালি, ঠান্ডা মিষ্টি পানি, আর পাহাড়ের মতো উঁচু ঢেউতোলা ডুনস—এক নির্জন লেগুনে সাঁতার কাটার সেই মুহূর্ত সত্যিই স্মৃতিতে গেঁথে যায়।

‘লেন্সোইস’ মানে বিছানার চাদর। ওপর থেকে তাকালে মনে হয় সত্যিই পৃথিবীর ওপর কেউ এক বিশাল সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। আর তার ভাঁজে জমে আছে ফিরোজা রঙের জলরাশি। এতটা নিখুঁত বৈপরীত্য—বালি ও পানি পৃথিবীর অন্য কোনো জায়গায় এত সুন্দরভাবে দেখা যায় না।

রিও, অ্যামাজন কিংবা ইগুয়াসুর ভিড় এড়িয়ে যারা প্রকৃত নির্জনতায় গিয়ে আত্মাকে পরিষ্কার করতে চান, লেন্সোইস মারানহেনসেস তাদের জন্য নৈঃশব্দ্যের স্বর্গ। এখানে নেই গাড়ির শব্দ, নেই জনতার কোলাহল—কেবল বালির চক্রবৎ ঢেউ, বাতাসের শিস আর লেগুনের নিরাবেগ স্বচ্ছতা।