গাজায় চলমান ইসরায়েলি বর্বরতার ফলে উপত্যকাজুড়ে দেখা দিয়েছে প্রচণ্ড খাদ্য সংকট। শুক্রবার জাতিসংঘের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, উপত্যকার শতভাগ মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে। সংবাদমাধ্যম এফটির খবর বলছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত বিতর্কিত সংস্থার মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ শুরুর ফলে গাজার বুভুক্ষু মানুষের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা ওসিএইচএর মুখপাত্র জেন্স লারকে বলেছেন, ‘গাজা উপত্যকা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুধার্ত এলাকা। গাজার শতভাগ মানুষই দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে। নিরাপত্তা জটিলতা ও প্রশাসনিক বাধার কারণে সেখানে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।’

ইসরায়েলি অবরোধের কারণে টানা দুই মাসের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি সামান্য কিছু ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করলেও নতুন বিতরণ কেন্দ্রগুলোয় বিশৃঙ্খলা ও অরাজক পরিস্থিতির কারণে কার্যত তা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। গত শুক্রবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এসব কেন্দ্রের কয়েকটি থেকে খাদ্য বিতরণ করা হলেও একাধিক সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বাকি বেশির ভাগ কেন্দ্রই ছিল বন্ধ। এর আগে গত মঙ্গলবার সেনা নিয়ন্ত্রিত ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র থেকে খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ৪৭ ফিলিস্তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর। অবশ্য ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব পাওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত সংস্থা গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলছে, ‘গত চারদিনে গাজায় ২০ লাখের বেশি ত্রাণ বিতরণ করেছে জিএইচএফ। এটি কেবল শুরু। আমরা আরো বিস্তৃত পরিসরে কাজ করে যেতে চাই।’

এদিকে গাজায় হামলা আরো বাড়িয়েছে ইসরায়েল। শুক্রবার এক ঘোষণায় উত্তর গাজা অঞ্চল সম্পূর্ণ খালি করার নির্দেশনা জারি করেছে তারা। জাতিসংঘ বলছে, গত ১৮ মার্চ শুরু হওয়া হামলায় নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৬ লাখ ৩২ হাজারের বেশি মানুষ। এ সময়ের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত চার হাজার ফিলিস্তিনি।

এ পরিস্থিতিতে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি ও বন্দিমুক্তি চুক্তির খসড়া প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রস্তাবে ইসরায়েল সম্মতি দিলেও হামাস এখনো এটি পর্যালোচনা করছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ছাড়া কোনো সাময়িক সমাধানের প্রস্তাবে রাজি হবে না। সংগঠনের শীর্ষ নেতা বাসেম নাইম বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘এ প্রস্তাব আমাদের জনগণের ন্যায্য ও বৈধ চাহিদা পূরণ করে না, বিশেষ করে যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে।’

সংবাদমাধ্যম এফটি জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রস্তাবের খসড়াটি তাদের হাতে এসেছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘যুদ্ধবিরতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে সৎ মনোভাবের ভিত্তিতে স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে আলোচনা চলবে।’ তবে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিষয়টি নিয়ে সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা নেই।

এদিকে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের যেকোনো দাবি বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি এর আগে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধবিরতি হতে পারে, তবে তা সাময়িকভাবে, শুধু জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার জন্য।’

তবে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ইসরায়েলের ওপর বৈশ্বিক চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। শুক্রবার গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। সিঙ্গাপুরে এক ভাষণে মাখোঁ বলেন, ‘ইসরায়েল যদি যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে অবস্থান না বদলায়, তাহলে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান আরো কঠোর করব।’ ওই সময় শর্তসাপেক্ষে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ারও ইঙ্গিত দেন তিনি। একে নৈতিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন মাখোঁ।

তবে চাপ বাড়লেও নিজেদের অবস্থানে অনড় ইসরায়েল। ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে তাকে ‘ইহুদি রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেয়। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ মাখোঁর বক্তব্যের জবাবে বলেন, ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কেবল কাগজে থাকবে, আর সে কাগজ ছুড়ে ফেলা হবে ইতিহাসের ভাগাড়ে।’