একসময় গাজার ঈদে বাতাসে ভাসত মামুল, কাহকের সুগন্ধ। আল-রিমালের মতো এলাকাগুলোয় উম্মে কুলসুমের ‘লাইলাতুল ঈদ’ গানে মুখরিত হতো— ‘হে ঈদের রাত, তুমি আমাদের আনন্দ দিয়েছ...’। শিশুরা খেলনা আর চকোলেট হাতে রাত জেগে উৎসবের জন্য অপেক্ষা করত। কিন্তু আজকের গাজার শিশুরা নতুন জামার পরিবর্তে গুনতে থাকে ইসরায়েলি বোমার সংখ্যা। তাদের ‘ঈদের উপহার’ শুধু একটি ভোর দেখার সুযোগ। জীবনের শেষ ইচ্ছা, একটুখানি আগের মতো আনন্দ ফিরে পাওয়া।

ইসরায়েলের টানা হামলায় গাজার প্রায় সব এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপ। মানবিক সংকটে জর্জরিত গাজাবাসী এবার কোরবানির পশু তো দূরের কথা, ন্যূনতম খাদ্যও জোগাড় করতে পারছে না। অনেক পরিবার এক মুঠো আটা বা সামান্য খাবারের আশায় দিন কাটাচ্ছে। কোরবানির মাংস তাদের কাছে এখন এক অলীক কল্পনা। সাধারণত ভেড়া ও দুম্বা কোরবানি দিয়ে থাকে ফিলিস্তিনিরা। পাশাপাশি গরু, ছাগল ও উটও কোরবানি দেয়া হয়। তবে কোরবানির জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পশু আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয় গাজার বাসিন্দাদের। যুদ্ধের কারণে পশু পালন সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে ইসরায়েলের অবরোধের কারণে পশু আমদানিও করা যাচ্ছে না। ফলে চাইলেও কোরবানি দিতে পারছে না গাজার মুসলিমরা। এছাড়া ঈদ উদযাপনের মতো কোনো পরিবেশ নেই গাজায়। অবরুদ্ধ এ উপত্যকার ২৩ লাখ বাসিন্দার প্রায় সবাই বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেকে কয়েক দফা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এরই মধ্যে এ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় সাড়ে ৫৪ হাজার ফিলিস্তিনি। এমনকি দুই বছর ধরে গাজা থেকে কোনো হজযাত্রী মক্কায় যেতে পারেনি।

ঈদের তাকবির ধ্বনির বদলে শোনা যাচ্ছে মায়ের আহাজারি, শিশুর কান্না আর মসজিদের ভাঙা মিনার থেকে ভেসে আসা ফাটল ধরা আজান।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, গাজায় বর্তমান পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। ইসরায়েলি অবরোধ, যুদ্ধ এবং মানবিক সহায়তার অভাবে খাদ্য ও ওষুধের সংকট ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। একজন স্থানীয় ইমাম বলেন, ‘ঈদের খুতবায় আমরা এখন তাকওয়ার কথা নয়, বলি কীভাবে বাঁচতে পারি। ঈদের আনন্দ যেন কেবল ইতিহাসের পাতায়ই রয়ে গেছে।’

গত ঈদুল ফিতরের কথা এখনো কাঁটার মতো বিদ্ধ হয়ে আছে গাজাবাসীর মনে। যুদ্ধবিরতির পতনের ঠিক দুই মাস পর হাজারো ফিলিস্তিনি ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ চত্বরে কিংবা স্কুল প্রাঙ্গণে ঈদের নামাজে দাঁড়ায়। সকালে যখন ঈদের তাকবির ধ্বনিত হওয়ার কথা, তখনই বিমান হানা। একদিনে নিহত হয় ১২৭ জন—যার ৭৫ শতাংশ নারী ও শিশু। কেউ খেলছিল নতুন জুতো পায়ে, কেউ হাতে পরেছিল ঈদের চুড়ি। পরদিন সেই শিশুদেরই পাওয়া গেল নিথর, রক্তাক্ত—তাদের শরীরে ঈদের পোশাক নয়, কাফনের সাদা কাপড়।

গাজায় প্রতিদিন ভোরে আকাশে সূর্য উঠলেও চারদিকে ধ্বংসস্তূপের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। ঈদের আনন্দ কি আর ফিরে আসবে—সে প্রশ্নই এখন গাজার প্রতিটি দেয়ালে গুমরে ওঠে।