যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী ও অস্থির আচরণ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন হিসাবনিকাশ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত অনেক দেশ এখন নতুন করে নিজেদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পর্যালোচনা করছে। এ পরিস্থিতিতে মিত্র দেশগুলো স্থিতিশীলতা ও বিকল্প অংশীদার খুঁজতে ক্রমেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের দিকে ঝুঁকছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি, আগ্রাসী বক্তব্য, ভূখণ্ড ও নিরাপত্তাবিষয়ক বিতর্কিত মন্তব্য এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মিত্রদের আস্থা নড়বড়ে করে দিয়েছে। গ্রিনল্যান্ড ও আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং শুল্ক হুমকি সে অনিশ্চয়তাকে আরো বাড়িয়েছে। যদিও কিছু সিদ্ধান্ত পরে প্রত্যাহার করা হয়েছে, তবু যুক্তরাষ্ট্রকে এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছে না অনেক দেশ।
এ সুযোগ কাজে লাগাতে সক্রিয় হয়েছে চীন। বেইজিং ইউরোপ ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছে। যদিও এসব দেশ দীর্ঘদিন চীনকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে এসেছে, বর্তমান বাস্তবতায় তারা চীনের সঙ্গে যোগাযোগের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না।
এর একটি উদাহরণ আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিনের সাম্প্রতিক চীন সফর। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করার চীনের বৃহত্তর কৌশল, যাকে অনেকেই ‘চার্ম অফেন্সিভ’ হিসেবে দেখছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পক্ষে জোরালো আহ্বান জানিয়েছে। গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বিশ্ব যদি সহযোগিতার পথে না হাঁটে, তাহলে আবার ‘বনের আইনে’ ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত একটি ‘সম্মিলিত ভবিষ্যৎ’ গড়ে তোলা।
এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় কানাডার অবস্থান বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সম্প্রতি বেইজিং সফর করে চীনের সঙ্গে নতুন কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণা দেন। তিনি চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক বড় মাত্রায় কমানোর সিদ্ধান্ত নেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতির সঙ্গে স্পষ্টভাবে ভিন্ন। ফলে কানাডার বাজারে চীনা ইভির উপস্থিতি বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউরোপের দেশগুলোও সতর্কতার সঙ্গে একই পথে এগোচ্ছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শিগগিরই চীন সফরে যেতে পারেন। অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো তার সফরের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। তবে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ইস্যুতে উদ্বেগ থাকায় লন্ডন এখনো চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছে।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ইউরোপের অনেক দেশের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে উত্তর ইউরোপের দেশগুলো এ বিষয়ে অনেকটা সংবেদনশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত অবস্থানের ফলে চীন নীরবে কূটনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে। যদিও বেইজিং প্রকাশ্যে এ পরিস্থিতিকে উদযাপন করছে না, তবু বর্তমান বৈশ্বিক টানাপড়েন চীনের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে যখন অস্থিরতা বাড়ছে, তখন অনেক মধ্যম শক্তির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী কূটনীতির পথে হাঁটছে। এ প্রেক্ষাপটে চীন ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।










