সুদানের গৃহযুদ্ধ এখন আর রাজধানী খার্তুম বা দারফুরে সীমাবদ্ধ নেই। সংঘাতের কেন্দ্র ধীরে ধীরে সরে এসেছে কোরদোফান ও আবেই অঞ্চলে। এ দুই এলাকায় রয়েছে জ্বালানি তেলের উৎস, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও সরবরাহ করিডোর এবং রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ। ফলে যে পক্ষ অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তারা পুরো যুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা পায়। খবর আল জাজিরা, বিবিসি ও ডয়চে ভেলে।
সুদানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা। ২০১৯ সালে দীর্ঘদিনের শাসক ওমর আল-বশির ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রত্যাশা জাগে। কিন্তু ২০২১ সালে আবার সেনা অভ্যুত্থান হয়। সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান ও তার তৎকালীন উপপ্রধান, আধাসামরিক বাহিনী রÅvপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগালোর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র হয়। বিশেষ করে আরএসএফকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করা ও নতুন বাহিনীর নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, এ প্রশ্নে সমঝোতা ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের লড়াই পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
কোরদোফান ও আবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত সুদানের ভূগোল ও সম্পদের কারণে। কোরদোফান দারফুর, খার্তুম ও দক্ষিণ সুদানের সংযোগস্থল। ফলে এ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে থাকলে সেনা ও অস্ত্র চলাচলের প্রধান পথও নিয়ন্ত্রণে থাকে।
অন্যদিকে আবেই একটি জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ ও দীর্ঘদিনের বিতর্কিত এলাকা, যা সুদান ও দক্ষিণ সুদানের মাঝখানে অবস্থিত। ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান স্বাধীন হলেও এ অঞ্চলের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তা এখনো নির্ধারণ হয়নি। জ্বালানি তেল উত্তোলন ও পরিবহনপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে উভয় পক্ষই এখানে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। ফলে অঞ্চলটি দখল মানে শুধু ভূমি নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগও পাওয়া।
সুদানে মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে দুই বছরের গৃহযুদ্ধে এক কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তিন কোটির বেশি মানুষ এখন খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। দারফুর ও কোরদোফানে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। সংঘাতের কারণে সহায়তা সংস্থাগুলোর কাজ বারবার ব্যাহত হওয়ায় প্রয়োজনীয় সাহায্য অনেক এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশটির এ সংকটময় পরিস্থিতিতে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জাতিসংঘ। কিন্তু চলমান গৃহযুদ্ধে সে ভূমিকা এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ২০০৫ সালে কম্প্রিহেনসিভ পিস অ্যাগ্রিমেন্টের পর সুদানে জাতিসংঘের মিশন শুরু হয়। পরে ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান স্বাধীন হওয়ার পর নতুন বাস্তবতায় একাধিক মিশন গঠন করা হয়। এর মধ্যে আবেই এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে ইউনাইটেড নেশনস ইন্টেরিম সিকিউরিটি ফোর্স ফর আবেই কাজ করছে।
সম্প্রতি কোরদোফান অঞ্চলে ড্রোন হামলায় জাতিসংঘের একটি লজিস্টিক ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু হয়। এতে ছয়জন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী নিহত হন এবং আরো আটজন আহত হন। এ ঘটনায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, শান্তিরক্ষীদের ওপর এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং এর জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।










