মিয়ানমার সামরিক জান্তা রাশিয়া ও চীন থেকে কেনা নতুন হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমান নিজেদের বিমানবাহিনীতে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সত্ত্বেও দুই দেশই জান্তাকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞায় অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ থাকলেও রাশিয়া ও চীন গত কয়েক বছরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে শত শত মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও বিভিন্ন সামরিক প্ল্যাটফর্ম দিয়ে এসেছে।

মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, মিয়ানমার তিনটি রুশ এমআই-৩৮-টি হেলিকপ্টার এবং দুটি চীনা ওয়াই-৮ পরিবহন বিমান হাতে পেয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, হেলিকপ্টারগুলো পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত সৈন্য মোতায়েন ও উদ্ধারকাজে ব্যবহৃত হবে, আর ওয়াই-৮ বিমানগুলো তাতমাদোর অভিযানে কৌশলগত বহর শক্তি বাড়াবে।

৭ নভেম্বর নেপিডোতে কমিশনিং অনুষ্ঠানে জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং বলেন, বৈশ্বিক সংঘাত ও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রমাণ করে সব ধরনের সামরিক বিমানের ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, বিমানবাহিনীর আধুনিকীকরণ জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় অংশ।

লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক মরগান মাইকেলস বলেন, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও মিয়ানমার সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে রাশিয়া তাদের জন্য কার্যত অক্সিজেন জোগান দিচ্ছে। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা জেনস জানিয়েছে, রুশ এমআই–৩৮টি মডেলের প্রথম রফতানি গ্রাহক এখন মিয়ানমার।

সাবেক তাতমাদো (মিয়ানমারি সেনাবাহিনীর সরকারি নাম) কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘মিলিটারি এক্সপার্টিজ ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্ম’। তারা বর্তমানে মিয়ানমারে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন সমর্থন করে আসছে। সংগেঠনটি মনে করে, এসব নতুন বিমান ও হেলিকপ্টার দেখায় যে, জান্তা ভবিষ্যতে আরো বেশি আকাশ অভিযান সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। দেশজুড়ে অভিযান তীব্র করবে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর মিয়ানজুড়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে নিরাপত্তাবাহিনীর প্রাণঘাতী দমন-পীড়নে অনেকেই সশস্ত্র প্রতিরোধে যোগ দেয় এবং দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে যায়। তাতমাদো ইতিমধ্যে দেশের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে গণতন্ত্রপন্থী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের কাছে। যারা বহু দশক ধরে অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করছে। তারপরও ভারী অস্ত্র ও বিমানশক্তির জোরে জান্তা এখনো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম এবং লড়াই থামানোর কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।

আাগামী ২৮ ডিসেম্বর দেশটির বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এ নির্বাচনকে সামরিক জান্তার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার কৌশ বলে অভিহিত করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনাবাহিনী দখল হারানো এলাকা পুনর্দখলে অভিযান আরো জোরদার করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উত্তরের শান রাজ্যের চারটি গুরুত্বপূর্ণ শহর পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে তারা। এই শহরগুলো চীনের সঙ্গে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বরাবর অবস্থিত। এর মধ্যে কৌশলগত শহর লাশিওও রয়েছে, যেটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি প্রধান সামরিক সদরদপ্তর।

এছাড়া সম্প্রতি চীনা কৌশলের কারণে মিয়ানমারের বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিরোধ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপে বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী জান্তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি করেছে। ফলে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে জান্তা সেনাবাহিনী। তাদের প্রধান লক্ষ্য এখন রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা। এজন্য আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে দেশটির সরকারি সেনাবাহিনী। রাখাইনের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে সমন্বিত স্থল, নৌ ও বিমান হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। এরই মধ্যে নিয়মিত বিমান হামলা চলছে রাখাইনের বিভিন্ন স্থানে।