নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও কাদার স্রোতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১৩০০ জনের বেশি। তাদের মধ্যে সাত শতাধিক বিদেশী নাগরিক। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, বিধ্বস্ত সড়ক এবং অব্যাহত বৃষ্টি উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত করছে। এ কারণে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপালে এখন পর্যন্ত ২৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে চিতওয়ানে ১০৮ জন, নওয়ালপরাসি পূর্বে ৬২ জন, ধাদিংয়ে ২৭ জন, গোর্খায় ২০ জন, রাসুওয়ায় ১৭ জন, নওয়ালপরাসি পশ্চিমে ১৫ জন, নুওয়াকোটে ১২ জন এবং তানাহুনে ৯ জনের মরদেহ রয়েছে। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন ১৩০০ জনের বেশি। নিখোঁজদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৪ জন, নেপাল পুলিশের ২৮ জন এবং আর্মড পুলিশ ফোর্স নেপালের ১৩ জন সদস্য রয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৬৪৪ জন পর্যটক। তাঁদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশী নাগরিক এবং ১২৭ জন নেপালি।

বুধবার হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ধসে বরফ, শিলা ও মাটির প্রবল স্রোত কয়েকটি পাহাড়ি জনপদের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। মানুষ পালানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই পানির সঙ্গে নেমে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ ঘরবাড়ি, সেতু ও যানবাহন ভাসিয়ে নেয়।

বৃহস্পতিবার নেপালের ড্রোনচিত্রে বিপর্যয়ের ব্যাপকতা ধরা পড়ে। নুয়াকোটের অনেক ভবনের দ্বিতীয়তলা পর্যন্ত কাদায় ঢেকে গেছে। গাছ ও বৈদ্যুতিক তারে ধ্বংসাবশেষ ঝুলতে দেখা গেছে। কাদার নিচে চাপা পড়েছে বহু গাড়ি। জেলার প্রায় ২৫টি বাড়ির সোলি গ্রামটি কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

বন্যায় কয়েক ডজন সেতু ধ্বংস এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে স্থলপথে অনেক দুর্গত এলাকায় পৌঁছাতে পারছেন না উদ্ধারকারীরা। নেপালের সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার সকালে হেলিকপ্টারে শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করেছে। আট বিদেশী নাগরিককে রাজধানী কাঠমান্ডুতে নেয়া হয়েছে। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় আটকে পড়া ব্যক্তিদেরও সরিয়ে নিয়েছে সেনাবাহিনী।

বন্যার মূল এলাকা থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান জেলায়ও মরদেহ পাওয়া গেছে। আহত কয়েক ডজন ব্যক্তিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নেয়া হয়েছে। নেপাল রেড ক্রস সোসাইটি জানিয়েছে, অনুসন্ধান ও উদ্ধারের পাশাপাশি এখন বড় পরিসরে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করা হয়েছে। অন্তত তিনটি গ্রামের প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

চীনের তিব্বতের গিরং স্থলবন্দরসংলগ্ন এলাকায় কাদার স্তর গড়ে দেড় মিটারের বেশি। কোনো কোনো সড়কে কাদা দুই মিটার ছাড়িয়েছে। বন্দরে যাওয়ার সব সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীন উদ্ধারকাজে একটি বড় সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ ও বিশেষায়িত দল পাঠিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য গিরংয়ে পৌঁছেছেন।

এদিকে ভূমিধসে নদীর প্রবাহ আটকে একটি হ্রদ তৈরি হওয়ায় দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সোগিয়াল ও পুরাপছিয়াংজাংবু নদীর মিলনস্থলে গঠিত হ্রদটি এরই মধ্যে উপচে পড়ছে। অস্থিতিশীল প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে গেলে আবারো বিপুল পরিমাণ পানি ও কাদা নিচের জনপদে নেমে আসতে পারে।

নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশী। তাদের মধ্যে ভারতের ১৭৮ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ জনের বেশি নাগরিক রয়েছেন। অন্যরা যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাপানসহ ৩০টির বেশি দেশের নাগরিক। তাদের অনেকেই তিব্বতের কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে ওই অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। তিব্বতে নিখোঁজ ৫৫৮ জনের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশী বলে জানিয়েছে চীন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস প্রথমে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করেছিল। পরবর্তী বিশ্লেষণে সংস্থাটি জানায়, এটি ভূমিকম্প নয়; ৫ দশমিক ২ মাত্রার সমতুল্য শক্তিশালী হিমবাহ ধস ছিল। এর ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ নিচের জনপদগুলোয় বিপর্যয়কর আঘাত হানে। ত্রিশূলী নদীর পানি মাত্র আধা ঘণ্টায় কোনো কোনো স্থানে প্রায় ৯ মিটার বেড়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।