সুদানের উত্তর দারফুরের রাজধানী এল ফাশের এখন যেন এক বিশাল বধ্যভূমি। স্যাটেলাইট ফুটেজে ধরা পড়েছে শহরের বিভিন্ন স্থানে মরদেহের স্তূপ, গণকবর আর বিশাল গর্তে মরদেহ পোড়ানোর দৃশ্য। আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) শহরটি দখল করার পর গত ছয় সপ্তাহে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তার প্রমাণ মুছে ফেলতেই এসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

মানবিক সহায়তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা জানান, শহরের রাস্তাঘাট, বাজার ও আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে থাকা মরদেহগুলো সংগ্রহ করে একত্র করা হয়েছে। এগুলো হয় গণকবরে দাফন করা হচ্ছে, নয়তো বিশাল গর্তে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। শহরটি এখনো জাতিসংঘের তদন্তকারীসহ বাইরের পর্যবেক্ষকদের জন্য সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকায় সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কমিটির সভাপতি সারাহ চ্যাম্পিয়ন সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শেষ তিন সপ্তাহে অন্তত ৬০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। যদিও এটি ‘সর্বনিম্ন অনুমান’, প্রকৃত পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। শহরটি আরএসএফ দখলের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বাসিন্দা নিখোঁজ রয়েছে। তাদের কেউ শহর ছাড়তে পেরেছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গত ২৬ অক্টোবর আরএসএফ ৫০০ দিনের অবরোধের পর নগরীটি দখল করে।

ইয়েল হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাবের পরিচালক ন্যাথানিয়েল রেমন্ড জানিয়েছেন, স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে, শহরটি অদ্ভুতভাবে খালি হয়ে গেছে। একসময় যে বাজারগুলো জমজমাট ছিল, সেগুলো এখন পরিত্যক্ত হয়ে গাছপালা আর ঘাসে ঢেকে যাচ্ছে এবং শহর থেকে সব গবাদিপশু সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তার মতে, এলাকাটি এখন ‘একটি বধ্যভূমিতে’ পরিণত হয়েছে।

শহরের ভেতর থেকে পাওয়া কিছু তথ্যসূত্র বলছে, অল্পসংখ্যক বাসিন্দাকে ছোট ছোট কেন্দ্রে আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তার কোনো উত্তর কারো কাছে নেই। আরএসএফ প্রতিশ্রুতি দিলেও উত্তর দারফুর রাজ্যের এ শহরটিতে এখনো জাতিসংঘ বা মানবিক সংস্থাগুলোকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে ত্রাণ সহায়তার ট্রাকগুলো আশপাশের শহরগুলোতে আটকে আছে। জাতিসংঘের এক সূত্র জানিয়েছে, প্রথমে নিরাপত্তা মূল্যায়ন দরকার। এখনো কোনো নাগরিক, সাহায্যকারী বা সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়।

এদিকে, যারা শহর থেকে কোনোমতে বের হতে পেরেছে, তাদের মধ্যে মারাত্মক অপুষ্টির খবর পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এল ফাশেরকে ‘দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, এ হত্যাযজ্ঞ সুদানের চলমান গৃহযুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ হতে পারে। এরই মধ্যে ৩২ মাসের সংঘাতে প্রায় চার লাখ মানুষ নিহত এবং প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। কিছু বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, প্রথম দুইদিনেই ১০ হাজারের মতো মানুষ নিহত হয়েছে।

এছাড়া দুই মাস আগে সামজাম শরণার্থী ক্যাম্পে আরএসএফের হামলা নিয়েও নতুন করে তদন্তের দাবি উঠেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ওই হামলায় বেসামরিক লোকজনকে টার্গেট করা, জিম্মি করা এবং মসজিদ-স্কুলসহ নানা স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব হামলার ধরন ইঙ্গিত দেয়, সংঘাতে নিয়মিতভাবে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এবং তা অবিলম্বে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি রাখে।