ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ ২০২২ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ সালজুড়ে অব্যাহত ছিল। ২০২৩ সালে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন। ক্ষমতার লড়াইয়ে সংঘাত বেড়েছে প্রতিবেশী মিয়ানমার আর উত্তর আফ্রিকার দেশ সুদানেও। তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রাণ গেছে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের। চ্যাটজিপিটি দিয়ে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

বিধ্বস্ত গাজা 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২০২৩ সালের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন। গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ‘অপারেশন আল আকসা ফ্লাড’ নামের অভিযান পরিচালনা করে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এতে নিহত হয় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নাগরিক, জিম্মি হয় আরো ২৪০ জন। এর প্রতিক্রিয়ায় সেদিন থেকেই নির্বিচারে গাজার নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলে পড়ে ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ)। একের পর এক হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় ২১ হাজারের বেশি মানুষকে। নিহতদের ৭০ ভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছে ৫৬ হাজার ৪৫১ জন। বোমার আঘাতে ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭০ ভাগ বাড়িঘর। জাতিসংঘের ধারণা, উপত্যকার ২৪ লাখ মানুষের মধ্যে ১৯ লাখই বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে গাজায় যুদ্ধবিরতির দাবি জোরালো হচ্ছে। তবে এমন দাবি উপেক্ষা করে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু। অন্যদিকে নির্বিচারে চালানো হামলার জবাবে সর্বাত্মক প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। তাদের প্রতিরোধের মুখে গাজায় এ পর্যন্ত নিজেদের ১৭২ সেনা নিহতের কথা স্বীকার করেছে আইডিএফ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুও এ যুদ্ধে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করার কথা স্বীকার করেছেন। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেন, ‘গাজায় খুব কঠিন একটি দিন পার করার পর এটি একটি কঠিন সকাল। এ লড়াইয়ে আমাদের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। তবে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার কোনো বিকল্প নেই।’

দেশে দেশে ভূমিকম্প 

তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ৭ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে দুই দেশে মৃত্যু হয় অর্ধলক্ষাধিক মানুষের। এর মধ্যে তুরস্কে ৪৪ হাজার ২১৮ জন ও সিরিয়ায় ৫ হাজার ৯১৪ জনের মৃত্যু হয়। আক্রান্ত এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গৃহহীন হয়ে পড়ে লাখো মানুষ। তুরস্কে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকার এগিয়ে এলেও বিপদে পড়ে সিরিয়ার উপদ্রুত অঞ্চলের বাসিন্দারা। কেননা দেশটির ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছিল বিদ্রোহীদের হাতে। ফলে সেখানে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাঠানোও খুব সহজ ছিল না। উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোয় গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে মৃত্যু হয় প্রায় তিন হাজার মানুষের। ক্ষতিগ্রস্তদের একটি বড় অংশ ছিল দুর্গম এলাকার বাসিন্দা। ফলে এসব স্থানে উদ্ধারকাজ পরিচালনা ও ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ভূমিকম্পে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ মেদিনার বিভিন্ন অংশ ও ঐতিহাসিক পর্যটক আকর্ষণ কুতুবিয়া মসজিদের মিনারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশে ৬ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পে মৃত্যু হয় দুই সহস্রাধিক মানুষের। 

মিয়ানমারে ক্ষমতার লড়াই 

মিয়ানমারে ২০২৩ সালও ছিল সহিংসতাপূর্ণ ও অস্থিতিশীল। বছরজুড়েই জান্তা সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই অব্যাহত ছিল। বিশেষ করে চীন সীমান্তবর্তী শান ও রাখাইন রাজ্যে জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় জান্তা সরকারকে। গত ডিসেম্বরে জান্তা বাহিনী ও জাতিগত তিনটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়। চীনের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ থেকে এ সম্মতি এলেও সংঘাত থামেনি। জান্তা বাহিনী আর বিদ্রোহীদের সংঘর্ষের বলি হয়েছে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়েছে অনেকে। জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গত অক্টোবরে একজোট হয় তিন সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ), মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) ও তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ)। ‘থ্রি ব্রাদার্স অ্যালায়েন্স’ নামের এ জোট ২৭ অক্টোবর তাদের অপারেশন শুরু করে। এরই মধ্যে তারা শান রাজ্যের সামরিক ঘাঁটি ও মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যপথের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের নিয়ন্ত্রণ নিতে সমর্থ হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

চ্যাটজিপিটির সুবাদে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটি সাধারণত লিখিতভাবে গ্রাহকদের যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়। গান বা কবিতা লেখা এমনকি কোডিংয়ের কাজেও সহায়তা করতে পারে এটি। চালুর মাত্র দুই মাসের মধ্যেই এটি ১০ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধনী বিল গেটসও মনে করেন, এটি বিশ্বকে আমূল বদলে দেবে। তবে অনেকের আশঙ্কা, নতুন এ প্রযুক্তির কারণে বেকার হয়ে পড়বে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ। এআইয়ের আরেক বিপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ডিপফেক প্রযুক্তি। এটি ব্যবহার করে একজনের ছবি অন্যের ভিডিওতে বসিয়ে দেয়া যায়। 

রেকর্ড তাপমাত্রা

বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয় গত জুলাইয়ে। ইউরোপীয় জলবায়ু পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র কোপার্নিকাসের হিসাব অনুযায়ী, গত ৬ জুলাই গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ছিল ১৭ দশমিক শূন্য ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ইতিহাসে এই প্রথম গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রির ওপরে উঠেছে। তীব্র গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা পার করেছে ইউরোপ-আমেরিকার কিছু অঞ্চলের বাসিন্দা, যেসব এলাকায় মানুষ শীতের সঙ্গে বেশি অভ্যস্ত।