গতকালের এ দুর্যোগে নেপালের রসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও গোরখা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাত সাড়ে ৮টায় নেপালে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, নিহত ও নিখোঁজদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশী নাগরিক থাকার খবর পাওয়া যায়নি। দূতাবাস পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

নেপাল পুলিশ গতকাল রাতে জানায়, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত দুর্গম এলাকাগুলোয় নিখোঁজদের সন্ধানে সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর উদ্ধার তৎপরতা চলছে। উদ্ধারকারী দলগুলো নদীর তলদেশ ও ধ্বংসস্তূপের নিচে আরো অনেকের আটকা পড়ে থাকার আশঙ্কা করছে। খবর বিবিসি

দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে এ দুর্যোগকে ‘আকস্মিক ও ভয়াবহ’ উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত ও গভীরভাবে মর্মাহত।’ নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তিনি।

নিখোঁজ পর্যটকদের বেশির ভাগই তিব্বতের কৈলাস মানস সরোবরের উদ্দেশে যাত্রা করছিলেন। বন্যাকবলিত পথটি লাংটাং ন্যাশনাল পার্ক ও গোসাইকুণ্ডে যাওয়ারও গুরুত্বপূর্ণ রুট। নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, নিখোঁজদের মধ্যে ১১৩ জন নেপালি, ১০৫ জন ভারতীয়, ৫৪ যুক্তরাষ্ট্রের ও ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক। নিখোঁজদের মধ্যে আরো রয়েছেন ১৭ জন মালয়েশীয়, চারজন দক্ষিণ আফ্রিকান এবং অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের একজন করে নাগরিক। এছাড়া আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক, যারা একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছিলেন, তাদেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, নেপালের হিমালয় সীমান্তে একটি বিশাল কাদা ও পাথরের স্তর নদীতে ধসে পড়ে। এতে লহেন্দে নদীতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নদীটি নেপাল ও তিব্বতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।

দুর্যোগটির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ভূমিকম্পের বিষয়টিও সামনে এসেছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ভূমিকম্পের কারণে পাহাড়ে তুষার ও পাথরের ধস বা তুষার ধস সৃষ্টি হয়ে বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেসও জানিয়েছে, আকস্মিক এ বন্যা ও ভূমিধসের প্রায় ৭ মিনিট আগে ওই অঞ্চলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল।

বন্যা-ভূমিধসে রসুয়া ও নুয়াকোটের ভোতেকোশি নদীর তীরবর্তী জনপদগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ নেপাল-চীন বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। ত্রিশূলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানের সেতু ভেসে গেছে। এ এলাকার সড়কগুলো নেপাল-চীন বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হওয়ায় অবকাঠামোর ক্ষতি সীমান্ত বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

চীনের তিব্বতেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তের গিয়রং এলাকায় কাদা ও পানির স্রোতে সীমান্ত চৌকির ভবন আংশিকভাবে ডুবে যায়। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সেখানে বড় ধরনের প্রাণহানির কথা জানিয়েছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। একই সঙ্গে দ্বিতীয় দফার দুর্যোগ ঠেকাতে নজরদারি ও আগাম সতর্কতা জোরদারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

গিয়রং কাউন্টি চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও পণ্যবাহী যান চলাচলের অন্যতম প্রধান সীমান্তপথ। সেখানে প্রায় চার হাজার মানুষের বসবাস। সীমান্তবর্তী তিব্বত অঞ্চলে চীনের কয়েকটি নির্মাণ প্রকল্পও চলছিল। দুর্যোগের পর ওই এলাকায় সড়ক, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতায় ২০০ জন ভূতত্ত্ব, প্রকৌশল ও জরুরি সেবাকর্মীকে ড্রোন, থ্রিডি লেজার স্ক্যানার ও জীবন শনাক্তকারী সরঞ্জামসহ মোতায়েন করা হয়েছে।

নেপালে উদ্ধার তৎপরতায় সেনাবাহিনীর ১৫টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৮৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধারকারীদের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে নিখোঁজদের দ্রুত উদ্ধার এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন তিনি। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা নিয়ে নেপালের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।