বৈশ্বিক এয়ারলাইনস খাত একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে পার করছে চলতি বছর। এসব সংকটের কিছু আগামী বছর অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে এয়ারলাইনস সংস্থাগুলোর সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ)। এর মধ্যে রয়েছে সরবরাহ চেইন সংকট, উড়োজাহাজ ডেলিভারিতে ধীরগতি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী জেট নির্মাণে পিছিয়ে যাওয়া। তা সত্ত্বেও ২০২৬ সালে খাতটি নিট মুনাফায় রেকর্ড করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএটিএ। খবর রয়টার্স।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালে এয়ারলাইনস খাতে আয় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে। আর নিট মুনাফা ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে, যার মার্জিন হবে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে উড়োজাহাজের সরবরাহ ঘাটতি পারফরম্যান্স বৃদ্ধিতে বাধা হয়ে থাকবে।

এছাড়া চলতি বছর এয়ারলাইনস কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত মুনাফা দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার ৯৫০ কোটি ডলারে, যা গত জুনে সংস্থার বার্ষিক বৈঠকে পূর্বাভাসকৃত ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বেশি।

বিশ্বের প্রায় ৩৬০টি এয়ারলাইনসের প্রতিনিধিত্ব করে আইএটিএ, যাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বৈশ্বিক আকাশপথের ৮০ শতাংশ সক্ষমতা। পূর্বাভাসে বলা হয়, ২০২৬ সালে রেকর্ড ৫২০ কোটি যাত্রী পরিবহন করবে এয়ারলাইনস সংস্থাগুলো। চলতি বছর মোট যাত্রী পরিবহন দাঁড়াতে পারে ৪৯৮ কোটিতে, যা ২০২৪ সালের রেকর্ড ৪৭৭ কোটির তুলনায় বেশি।

বিশ্বের শীর্ষ উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িং ২০২৪ সালের শুরু থেকে নানা ধরনের বিপত্তি মোকাবেলা করে বর্তমানে ব্যবসা পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। অন্যদিকে ডেলিভারি লক্ষ্য কমাতে বাধ্য হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাস। সম্প্রতি তাদের এ৩২০ মডেলের আকাশযানের কিছু ধাতব ফিউজলাজ প্যানেলে গুণগত সমস্যা পাওয়া গেছে।

ফ্লাইট পরিচালনায় ব্যবহৃত জ্বালানির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে অনেক দিন ধরে কথা হচ্ছে। এছাড়া জ্বালানির দামও বাড়ছে। সংস্থাগুলো বলছে, জ্বালানি সাশ্রয়ী উড়োজাহাজ না পেলে যাত্রী পরিষেবা বৃদ্ধি ও জ্বালানি খরচ কমানো দুটোর কোনোটিই করা যাবে না। তার পরও আকাশপথে যাত্রী বৃদ্ধির আশাবাদী সুর বজায় রেখেছে আইএটিএ। আগামী বছর বিশেষভাবে ইউরোপের ফ্লাইটে যাত্রী বাড়বে। যাত্রীপ্রতি নিট মুনাফার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে মহাদেশটি।

এয়ারলাইনস খাতের এ ট্রেড বডির মহাপরিচালক (ডিজি) উইলি ওয়ালশ বলেন, ‘এয়ারলাইনসগুলো ব্যবসায়িক ধাক্কা সামলানোর মতো সহনশীলতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা স্থিতিশীল মুনাফা দিচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘জেট ফুয়েলের দাম কিছুটা কমলে স্বস্তি মিলতে পারে ঠিকই। কিন্তু নিয়ন্ত্রক ব্যয় বিশেষত ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন এবং বৈশ্বিক সংঘাত, ড্রোন হামলার ঝুঁকি ও জিপিএস হস্তক্ষেপের অনিশ্চয়তা বৃহত্তর মুনাফায় বাধা দিচ্ছে।’

ওয়ালশ জানান, চলতি বছর এয়ারবাসের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়েছে। বিপরীতে বোয়িংয়ের পারফরম্যান্স সরবরাহ চেইন সমস্যা চলতে থাকলেও উন্নতি দেখাচ্ছে।

চলতি মাসের শুরুতে এয়ারবাসকে কিছু ফিউজলাজ প্যানেলে ত্রুটি ধরা পড়ার কারণে ডেলিভারি টার্গেট কমাতে হয়। এর ঠিক কয়েক দিন আগে মহাজাগতিক বিকিরণের সঙ্গে যুক্ত একটি সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে ছয় হাজার এ৩২০ সিরিজের উড়োজাহাজ রিকল করেছিল। উইলি ওয়ালশ বলেন, ‘বোয়িংয়ের পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। তারা আকাশযান সরবরাহের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা রক্ষা করবে। এ নিয়ে শিল্পজুড়ে আস্থা বেড়েছে, আর একই সঙ্গে এয়ারবাসের প্রতি আস্থা কমছে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর একাধিক দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছেন। এতে বিশেষ সুবিধা পেয়েছে বোয়িং। চুক্তিতে কয়েকশ বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে সম্মত হয়েছে বিভিন্ন দেশ।

তবে নতুন উড়োজাহাজ সরবরাহে ধীরগতিকে ‘হতাশাজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন আইএটিএ-প্রধান, যা আগামী বছরও অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি শিল্পের জন্য হতাশাজনক। কারণ প্রত্যাশার তুলনায় কম নতুন উড়োজাহাজ ডেলিভারি হবে।’

ডেলিভারি আটকে যাওয়ার জন্য ইঞ্জিন নির্মাতাদেরও দায়ী করেন উইলি ওয়ালশ। তিনি বলেন, ‘নতুন ও মেরামত করা ইঞ্জিন সরবরাহে তারা উড়োজাহাজের মূল কাঠামো নির্মাতাদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। ফলে জেট নির্মাতারা টাইমলাইন পিছিয়ে দিচ্ছে।’

উইলি ওয়ালশ বলেন, ‘সরবরাহকারীরা যেভাবে দাম বাড়াচ্ছে আর যেভাবে ওইইএম কোম্পানিগুলো (যারা উড়োজাহাজ বা ইঞ্জিন বানায়) এত বেশি মুনাফা করছে, তাতে সমস্যাসংকুল অবস্থায়ও তাদের মুনাফা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।’

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি জানান, চলমান সমস্যার প্রেক্ষাপটে ইঞ্জিন নির্মাতাদের মুনাফার মার্জিন এখনো অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে জিই অ্যারোস্পেসের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

অবশ্য জিই অ্যারোস্পেসের সিইও ল্যারি কাল্প অক্টোবরে বলেছিলেন, সরবরাহ চেইন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রচেষ্টা ফল দিতে শুরু করেছে। যা তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এয়ারবাসের কাছে জেট ইঞ্জিন সরবরাহে বিলম্ব কমাতে সাহায্য করেছে।