জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সম্প্রতি সর্বসম্মতিক্রমে মালিতে এক দশক ধরে চলমান শান্তিরক্ষা মিশন বন্ধ করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশটির সামরিক কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে শান্তিরক্ষী বাহিনীকে দেশ ত্যাগের নির্দেশনা দেয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। তবে মালি থেকে সৈন্য ত্যাগের নির্দেশনার বিষয়টিকে রাশিয়ার ভাগনার গ্রুপের সাজানো পরিকল্পনা হিসেবে অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। খবর রয়টার্স।

নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে মালিতে শান্তিরক্ষা বাহিনীর সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট সব সদস্য ও কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। প্রতিবেদন বলছে, সংস্থাটির এ সিদ্ধান্তে আসা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। কেননা মালিতে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার আকস্মিকভাবেই শান্তিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডকে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে।

মালিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে ১৩ হাজার কর্মকর্তা ও সেনাসদস্য ‘মিনুসমা’ নামের মিশনটিতে কর্মরত ছিলেন। এ মিশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জনগণকে বিদ্রোহী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো থেকে নিরাপত্তা দেয়া। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে হঠাৎ করে মিশন বন্ধ করে দেয়ার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। কেননা মালির সশস্ত্র বাহিনীর অস্ত্র ও সামরিক উপকরণ যথেষ্ট পরিমাণে নেই। ২০২১ সালে রাশিয়াভিত্তিক বেসরকারি যোদ্ধা কোম্পানি পিএনসি ভাগনারের সঙ্গে চুক্তি করে দেশটির সরকার। সেই থেকে ভাগনার গ্রুপের প্রায় এক হাজার যোদ্ধা মালির কেন্দ্রীয় ও উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে।

জাতিসংঘের এ অভিযানের সমাপ্তি বহু বছর ধরে দেশটিতে চলা উত্তেজনা ও সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরে ঘটেছে। এর পেছনে ভাগনার যোদ্ধাদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কেননা ২০২১ সালে রাশিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধা বাহিনী ভাগনার গ্রুপ মালিতে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেয়ার পর থেকেই অভিযান পরিচালনায় কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে শান্তিরক্ষী বাহিনী। গ্রুপটি সম্প্রতি রাশিয়ায় একটি ব্যর্থ সশস্ত্র বিদ্রোহের সঙ্গেও জড়িয়েছিল।

নিরাপত্তা পরিষদে মিশন বন্ধের বিষয়ে ভোটাভুটির সময় ভাগনারের প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিনকে মালি থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর প্রস্থানের পেছনের কারণ বলে দায়ী করেছে হোয়াইট হাউজ। বৈঠকে জাতিসংঘের যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি জন কিরবি বলেন, ‘শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ মূলত মালির ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের সঙ্গে ভাগগনারের প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিনের সমঝোতার ফল। জাতিসংঘ বাহিনীকে বিদায় দেয়ার ক্ষেত্রে প্রিগোজিন যে কলকাঠি নেড়েছেন তা অনেকেই জানে না। কিন্তু আমরা জানি যে মালির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা এখন ভাগনারের নির্দেশেই চলছে।’ তথ্য বলছে, ২০২১ সালের শেষ থেকে ভাগনারকে ২০ কোটি ডলারেরও অধিক অর্থ দিয়েছে মালির ক্ষমতাসীন সরকার।

জাতিসংঘে নিয়োজিত রাশিয়ার প্রতিনিধি অ্যানা ইভস্টিগনেভা নিরাপত্তা পরিষদের বক্তব্যে বলেন, ‘মালি নিজস্ব সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা মালির পরিস্থিতি নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ ও নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে চাই। রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে মালিকে ব্যাপক সহায়তা অব্যাহত রাখবে।’

জাতিসংঘে নিয়োজিত মালির প্রতিনিধি ইসা কনফোরু বলেন, ‘মালি সরকার নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়টি আমলে নিয়েছে। সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা হবে। আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সমর্থন ও সম্মান সাপেক্ষে কাজ করতে ইচ্ছুক এমন সব অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ কাজের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে মালি।’

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের এক বিদ্রোহের পর থেকে সহিংসতা প্রতিরোধে লড়াই করছে মালি। এর পর থেকে দেশটির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ২০১৩ সালে মিনুসমা মিশন চালু করেছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।