ইন্ডিয়া স্ট্যাক কী? এটি একটি ওপেন অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস, যা এপিআইসহ ডিজিটাল পাবলিক গুডসের একটি সমষ্টি, যা ভারতের মৌলিক ডিজিটাল পরিকাঠামো গঠন করে। এর উপাদানগুলো সম্মিলিতভাবে সরকার, ব্যবসা ও ব্যক্তিসহ বিভিন্ন সত্তাকে ডিজিটাল উপায়ে যোগাযোগ ও লেনদেন পরিচালনা করতে সক্ষম করে তোলে। আধার (পরিচয়), ইউপিআই (আর্থিক লেনদেন), ডিজিলকার (নথিপত্র), ই-সাইন (ডিজিটাল স্বাক্ষর), ই-কেওয়াইসি (আপনার গ্রাহককে জানুন), ডিবিটি (সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর), আয়ুষ্মান ভারত ডিজিটাল মিশন (স্বাস্থ্যসেবা) ইত্যাদির মতো ইন্ডিয়া স্ট্যাক উপাদান নাগরিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ডেভেলপারদের কাগজবিহীন, উপস্থিতিবিহীন ও নগদবিহীন লেনদেন ও সেবা গ্রহণে সক্ষম করে।
ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি: ইন্ডিয়া স্ট্যাক হলো একটি কাঠামো, যার লক্ষ্য ভারতের ডিজিটাল রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি করা। যদিও প্রকল্পটির নামে ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটি বহন করে, ইন্ডিয়া স্ট্যাকের দর্শন কোনো একক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি উন্নত অথবা উন্নয়নশীল বা উদীয়মান যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। এ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ প্রকল্পের বিষয়ে পরিকল্পনা করা হয় এবং ২০০৯ সালে আধার ইউনিক আইডেন্টিটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে এটি প্রথম বাস্তবায়িত হয়। এই ইন্ডিয়া স্ট্যাককে নাগরিকদের বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান করার লক্ষ্যে প্রযুক্তি ও তথ্যের (ডেটা) শক্তি ব্যবহার করে একটি নিরাপদ ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য প্লাটফর্ম হিসেবে বিন্যস্ত করা হয়েছে।
যেভাবে কাজ করে এই ইন্ডিয়া স্ট্যাক: এই ইন্ডিয়া স্ট্যাক পাঁচটি স্তরের মাধ্যমে কাজ করে থাকে।
ক্যাশলেস লেয়ার, যা ন্যাশনাল পেমেন্টস করপোরেশন অব ইন্ডিয়ার (এনসিপিআই) মালিকানায় পরিচালিত একটি আন্তঃপরিচালনযোগ্য পেমেন্ট নেটওয়ার্ককে সমর্থন করে। এ স্তরে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে আইএমপিএসের মতো পেমেন্ট প্লাটফর্ম, যা একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তাৎক্ষণিক ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারের সুবিধা প্রদান করে এবং ইউপিআই হলো একটি তাৎক্ষণিক রিয়েলটাইম পেমেন্ট সিস্টেম, যা একজন ব্যক্তি বা ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য ব্যক্তি বা ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করার সুযোগ প্রদান করে এবং এভাবে নোট ও কয়েনের ব্যবহারকে প্রতিস্থাপিত করে। কভিড চলাকালে ইউপিআই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং সেই সময় থেকে এটি ভারতের মধ্যে অব্যাহতভাবে দ্রুত বাড়ছে। এইপিএস (আধার এনাবেলড পেমেন্টস সিস্টেম) এবং এপিবি (আধার পেমেন্ট ব্রিজ)-এর মতো অন্যান্য প্লাটফর্মও লেনদেনের খরচ ও ঝুঁকি হ্রাস করে।
পেপারলেস লেয়ার রিয়েলটাইম ভিত্তিতে তথ্য সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধার করার সুবিধা প্রদান করে। ডিপার্টমেন্ট অব ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইনফরমেশন টেকনোলজির মালিকানাধীন এ স্তরের মধ্যে ই-সাইন, ই-কেওয়াইসি ও ডিজিলকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রেজেন্স-লেস লেয়ার-টি ওপেন এপিআইসহ ইউনিক ডিজিটাল বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি (আধার) প্রদান করে, যা বস্তুগত নথিপত্র ছাড়াই যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় রিয়েলটাইম যাচাইকরণকে সক্ষম করে, ফলে জালিয়াতি হ্রাস পায় এবং ডিজিটাল পরিষেবাগুলোতে অ্যাকসেস সহজ হয়।
কনসেন্ট লেয়ারটি ব্যক্তিদের একটি নিরাপদ অনুমোদিত শেয়ারিং কাঠামোর মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে, যেখানে রয়েছে সময়/উদ্দেশ্য সীমার জন্য ইলেকট্রনিক ডেটা কনসেন্ট (ইডিসি), স্বচ্ছতার জন্য কনসেন্ট আর্টিফ্যাক্ট এবং তথ্যপ্রবাহ পরিচালনার জন্য নিয়ন্ত্রিত সত্তা যেমন অ্যাকাউন্ট অ্যাগ্রিগেটর (এএ)। এটি কীভাবে কাজ করে? উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রয়োজন হয়, তিনি/প্রতিষ্ঠানটি তাদের আর্থিক তথ্য যেমন ব্যাংক স্টেটমেন্ট শেয়ার করার অনুমতি দেন একটি ‘এএ’-এর মাধ্যমে। ‘এএ’ সেই অনুমোদনের ভিত্তিতে নিরাপদভাবে ব্যাংক থেকে তথ্য পুনরুদ্ধার করে এবং ব্যবহারকারীর কনসেন্ট আর্টিফ্যাক্টে নির্দিষ্ট অনুমতির সঙ্গে সেই তথ্য ঋণ প্রদানকারীর সঙ্গে শেয়ার করে।
কমার্স লেয়ারটি ওপেন নেটওয়ার্ক ফর ডিজিটাল কমার্স (ওএনডিসি) দ্বারা পরিচালিত, যা একটি সেকশন ৮ (লাভের জন্য নয়) কোম্পানি। এতে আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা, মানসম্মত ক্রিয়াকলাপ (ইনভেন্টরি, ক্যাটালগিং), ডেটা প্রাইভেসি ও একটি সম্মতিভিত্তিক কাঠামোর জন্য উন্মুক্ত প্রটোকল রয়েছে, যা ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন একীকরণকে সক্ষম করে। এটি একাধিপত্য হ্রাস করতে, একটি প্রতিযোগিতামূলক ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস গড়ে তুলতে, এমএসএমই ও আশপাশের কিরানা (মুদিখানা) দোকানের মতো ছোট বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা কমাতে সহায়তা করে। এ স্তরের ভিত্তি ভারতের ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের (ডিপিআই) ওপর স্থাপিত, যা আধার, ইউপিআই, ডিজিলকার ও কনসেন্ট লেয়ার ব্যবহার করে থাকে।
ইন্ডিয়া স্ট্যাক নিয়ে ভারতের অভিজ্ঞতা: নিরাপদ ও সুরক্ষিত আর্থিক, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য পরিষেবা পেতে লাখ লাখ ভারতীয় নাগরিক ও বাসিন্দা ইন্ডিয়া স্ট্যাক-নির্মিত ডিপিআইয়ের বিভিন্ন উপাদানে যোগদান করেছেন। এর মূল অর্জনগুলো হলো:
নাগরিকদের পরিপূর্ণ পরিষেবা প্রদান করে থাকে; মূল লক্ষ্য জনগণের জীবনমানকে উন্নত করে তোলা; কয়েক বছরের উদ্ভাবনের ফল রূপে একটি পণ্য; একটি কাগজবিহীন ও নগদহীন বিতরণ ব্যবস্থা।
এটি উদ্ভাবনী সমাধান ও স্টার্টআপের সৃষ্টিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবেলা করে এবং সব শ্রেণীর জনগণের জন্য পরিষেবার অ্যাকসেস উন্নত করে। ভারতের অভিজ্ঞতাকে নিম্নলিখিত ফলাফলে সংক্ষেপিত আকারে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন (আর্থিক অন্তর্ভুক্তি): ইন্ডিয়া স্ট্যাক ব্যাংকিং, অর্থ প্রদান এবং আর্থিক পরিষেবার জন্য একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম প্রদান করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যারা আগে আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বাদ পড়েছিলেন, যারা ব্যাংকিং পরিষেবার বাইরে ছিলেন বা ব্যাংকিং পরিষেবার ঘাটতিতে ছিলেন, এটি এমন জনগণকে ডিজিটাল অর্থ প্রদান পদ্ধতিগুলো অ্যাকসেস করতে সক্ষম করেছে।
অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (পরিষেবাগুলোয় প্রবেশাধিকার): ইন্ডিয়া স্ট্যাকের কারণে নাগরিকরা ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে বিস্তৃত পরিসরে সরকারি পরিষেবা, আর্থিক পরিষেবা, স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবা, শিক্ষা সংস্থান ও আরো অনেক কিছু অ্যাকসেস করতে পারে, যেগুলো সুবিধা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করে।
অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড ইনোভেশন (উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবন): ইন্ডিয়া স্ট্যাকের ওপেন এপিআই স্টার্টআপ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর নতুন পরিষেবা তৈরি করার সুযোগ দিয়ে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করেছে। ফলে একটি প্রাণবন্ত প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের উন্নয়ন ঘটেছে।
রিডিউসড করাপশন (দুর্নীতি হ্রাস): ডিবিটি ও ডিজিটাল ভর্তুকি সক্ষম করার মাধ্যমে সরকার থেকে নাগরিকদের আর্থিক সুবিধা এখন অতীতের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি ডিবিটির মাধ্যমে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায়। ইন্ডিয়া স্ট্যাক এভাবে সরকারি সুবিধা ও ভর্তুকি বিতরণের ক্ষেত্রে অপচয় ও দুর্নীতি কমাতে সহায়তা করছে।
ভারতের মডেলটি বিশ্বব্যাপী প্রতিলিপি করা হচ্ছে, যেখানে ইন্ডিয়া স্ট্যাক অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য একটি ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে কাজ করছে।
যদিও ডেটা প্রাইভেসি, সাইবারসিকিউরিটি, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও নিয়ন্ত্রক পর্যবেক্ষণে কিছু প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত রয়েছে, ইন্ডিয়া স্ট্যাক দেশের জনগণের জন্য ভালোভাবে সেবা প্রদান করেছে। এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য বেশ কয়েকটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশকে তাদের নিজস্ব ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) নির্মাণে সহায়তা করছে।
দেবনাথ শ: ভারতীয় সাবেক কূটনীতিক










