এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে। এশিয়া ও ইউরোপের প্রধান বাজারগুলোয় গতকাল মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের সূচক কমেছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে। খবর এপি।
ফেডের নীতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে গত শুক্রবারের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তও থাকতে পারে।’
তার এ বক্তব্যের পর বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে ফেড ফের কঠোর নীতি নিতে পারে।
এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজারে। ওয়ার্শের বক্তব্যের আগে দুই বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশে।
বন্ডের ইল্ড বেড়ে যাওয়াকে বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হয়। কারণ স্বল্পমেয়াদি সুদহার নিয়ে ফেড কী করতে পারে, তা দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ডে দ্রুত প্রতিফলিত হয়। ইল্ড বাড়ার অর্থ হলো বাজারে সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রত্যাশা বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। কারণ সুদহার বাড়লে কোম্পানির ঋণের খরচ বাড়ে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে কোম্পানির মুনাফা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়। আবার সুদহার বাড়লে তুলনামূলক নিরাপদ বন্ডে বিনিয়োগের আকর্ষণও বাড়ে। ফলে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইউরোপের বাজারে গতকাল এরই প্রতিফলন দেখা যায়। জার্মানির প্রধান সূচক ড্যাক্স দশমিক ৯ শতাংশ কমে ২৬ হাজার ৩৩৯ দশমিক শূন্য ৪ পয়েন্টে নেমে যায়। ফ্রান্সের প্যারিসভিত্তিক সিএসি ৪০ সূচকও দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। এদিন ব্যাংক হলিডের কারণে যুক্তরাজ্যের শেয়ারবাজার বন্ধ ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও দুর্বল শুরুর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গতকাল লেনদেন শুরুর আগে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজের ফিউচার দশমিক ২ শতাংশ কমে যায়। এর অর্থ হলো দিনের লেনদেনে সূচক দুটি নিম্নমুখী থাকতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
এর আগে শুক্রবারও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে দরপতন দেখা যায়। ওইদিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। ডাও জোনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজের পতন ছিল দশমিক ১ শতাংশের কম। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট সূচক কমেছে দশমিক ৫ শতাংশ।
এশিয়ার বাজারেও গতকাল ছিল মিশ্র চিত্র। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক দশমিক ১ শতাংশ কমে ৬৬ হাজার ৩১১ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে দাঁড়ায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক শুরুতে কমলেও পরে ঘুরে দাঁড়ায়। দিন শেষে সূচকটি দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৮২০ দশমিক শূন্য ২ পয়েন্টে ওঠে।
হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক দশমিক ১ শতাংশ কমে ২৫ হাজার ৫৬৬ দশমিক ৯৯ পয়েন্টে নেমেছে। বিপরীতে চীনের সাংহাই কম্পোজিট সূচক দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৯৮৬ দশমিক ৩০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচকও দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।
তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক কমেছে দশমিক ৪ শতাংশ। ভারতের সেনসেক্সও দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ এশিয়ার বাজারগুলোয় বিনিয়োগকারীরা একদিকে ফেডের সুদহার নিয়ে নতুন সংকেত বিশ্লেষণ করছেন, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও বাজারের গতিপথে প্রভাব ফেলছে।
বিশ্ব শেয়ারবাজারে চাপের আরেকটি কারণ মধ্যপ্রাচ্যের নতুন উত্তেজনা। যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। প্রায় এক মাস পর এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়। ফলে সেখানে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি শেয়ারবাজারেও পড়তে পারে। কারণ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও অন্যান্য ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়। এতে অনেক কোম্পানির মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়ে।
গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলার ৪০ সেন্টে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দামও একই হারে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৬ ডলার ৫৮ সেন্টে দাঁড়ায়। ফলে বিনিয়োগকারীদের সামনে এখন একসঙ্গে দুটি বড় ঝুঁকি রয়েছে—সুদহার ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা।
ফেডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা কঠোর হবে। ফেডের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে নামিয়ে আনা। কিন্তু সুদহার বাড়ালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হতে পারে। কোম্পানির আয় কমতে পারে। এতে শেয়ারবাজারে আরো চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য কম সুদহার চান। তিনি ফেডের ওপর সুদহার কমানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছেন। তবে ফেড চেয়ারম্যান ওয়ার্শ গত শুক্রবার বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ও শ্রমবাজারকে শক্তিশালী রাখা। এ লক্ষ্য পূরণে স্বল্পমেয়াদি সুদহারই ফেডের প্রধান হাতিয়ার।’
মুদ্রাবাজারেও এ পরিস্থিতির প্রভাব দেখা গেছে। গতকাল ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েন কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েন ১৫৯ দশমিক ৭৫-এ নেমে এসেছে। আগের অবস্থান ছিল ১৬০ দশমিক ১০ ইয়েন। অন্যদিকে ইউরোর মূল্য বেড়ে ১ দশমিক ১৬০১ ডলারে উঠেছে। আগের অবস্থান ছিল ১ দশমিক ১৫৮০ ডলার।
সব মিলিয়ে বিশ্ব শেয়ারবাজার এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। একদিকে ফেডের সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন উত্তেজনা। এর সঙ্গে রয়েছে চীনের অর্থনীতির ধীরগতি ও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ। ফলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমিয়ে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। আগামী দিনগুলোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে বিশ্ব শেয়ারবাজারের গতিপথ।










