সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্ত ও দুর্নীতির প্রতিবাদে নেপালজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল সকাল থেকে শুরু হওয়া ‘জেনারেশন জেড’-এর বিক্ষোভে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৭ জন রাজধানী কাঠমান্ডুতে ও দুজন নিহত হয়েছেন ইটাহারি শহরে। রাজধানী কাঠমান্ডুর বিভিন্ন এলাকা ও ইটাহারিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে সেনা ও আধাসামরিক বাহিনী। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক অসন্তোষ, শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং তরুণদের হতাশার বহিঃপ্রকাশ এ আন্দোলন। বেকারত্ব, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অকার্যকর নীতি এবং বঞ্চনার মতো নানা সমস্যা এ ক্ষোভকে আরো তীব্র করে তুলেছে।

বিক্ষোভে হতাহতের জেরে পদত্যাগ করেছেন নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক। গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক হয়। এ বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন রমেশ লেখক। বৈঠকে অংশ নেয়া দেশটির একজন মন্ত্রীর বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট বলেছে, জেন-জিদের বিক্ষোভে হতাহতের এ ঘটনায় নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে রমেশ লেখক পদত্যাগ করেছেন।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর রাস্তায় গতকাল সকাল থেকে বিক্ষোভের শুরু। নিউ বানেশ্বর এলাকায় প্রথমে ছোট ছোট দলে জড়ো হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণরা। হাতে ছিল নানা স্লোগান লেখা প্লাকার্ড—‘দুর্নীতির অবসান চাই’, ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দাও’, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ মানি না’।

বিক্ষোভের শুরুটা শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা হলেও দুপুরের দিকে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। বিক্ষোভকারীরা ফেডারেল পার্লামেন্টের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। নিরাপত্তা বাহিনী প্রথমে ব্যারিকেড দিয়ে ঠেকাতে চাইলেও ব্যর্থ হয়, এরপর আন্দোলনকারীদের দিকে টিয়ার গ্যাসের শেল, জলকামান থেকে পানি ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে সেখানে কয়েকজন নিহত হন। এরপরই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র রাজধানীতে। আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে পোখারা, বুটওয়াল, ভৈরহাওয়া, ভরতপুর, ইটাহারি ও দামাকসহ বহু শহর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাঠমান্ডুসহ বেশ কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি করলেও উত্তেজনা কমেনি। কারফিউ ভেঙে তরুণদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ জনতাও।

41

কাঠমান্ডু পুলিশের মুখপাত্র শেখ খানাল বিবিসিকে জানিয়েছেন, রাজধানীতে সংঘর্ষে ১৭ জন নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা সহিংস হয়ে উঠলে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও জলকামানের পানি ছুড়তে বাধ্য হয়। ইটাহারির স্থানীয় পুলিশ বিবিসিকে জানিয়েছে, শহরটিতে বিক্ষোভ-সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছে। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজারাম বাসনেত বিবিসিকে বলেন, কারফিউর পর সেনাবাহিনীর ছোট ইউনিট কাঠমান্ডুতে মোতায়েন করা হয়েছে। নেপালের যোগাযোগমন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা বিবিসিকে জানিয়েছেন, পুলিশকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বলপ্রয়োগ করতে হয়েছে—যার মধ্যে ছিল জলকামান ব্যবহার, লাঠিচার্জ এবং রাবার বুলেট ছোড়া।

নেপালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এক বিবৃতিতে নিরাপত্তা বাহিনী ও আন্দোলনকারীদের সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানায়। সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিশ্চিত করে উল্লেখ করে কমিশন বলেছে, বিক্ষোভের সহিংসতায় রূপ নেয়া ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ দুটোই দুঃখজনক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা ছিল এ আন্দোলনের মূল কারণ। কয়েক সপ্তাহ আগে প্রশাসন দাবি করেছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘ভুয়া খবর’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা’ বন্ধ করতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। গত বৃহস্পতিবার নেপাল সরকার ঘোষণা দেয় নির্ধারিত নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অংশ না নেয়ায় ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), ইউটিউবসহ বেশির ভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা হবে।

কিন্তু তরুণ প্রজন্ম এটিকে সরাসরি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছে। নেপালের ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা জেনারেশন জেডের কাছে ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম শুধু বিনোদনের জায়গা নয়—বরং এটি তাদের রাজনৈতিক আলোচনা, সংগঠিত হওয়া এবং সামাজিক প্রতিবাদের প্লাটফর্ম। তারা এটাকে কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা হিসেবেই নিয়েছে।

প্রথমে আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। কিন্তু দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবিতে উত্তপ্ত এ জনসমাবেশে কিছু সময়ের মধ্যে যুক্ত হয় শহরের নানা প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ। বেকার যুবক, ছোট ব্যবসায়ী, এমনকি কিছু সরকারি চাকরিজীবীকেও ভিড়ের মধ্যে দেখা গেছে। তারা অভিযোগ তুলেছেন—বছরের পর বছর দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অকার্যকর নীতি নেপালের অর্থনীতিকে স্থবির করে রেখেছে। শিক্ষিত যুবকরা চাকরি পাচ্ছে না, সরকারি সেবা খাতে অনিয়মে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, আর রাজনীতিবিদদের মধ্যে নেই স্বচ্ছতা।

প্রশাসনের দাবি, পুলিশের ওপর হামলা এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার দায় আন্দোলনকারীদেরই। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য ভিন্ন— তারা বলছেন, পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগই সহিংসতার মূল কারণ। অনেকেই জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ মিছিলেই প্রথম টিয়ার গ্যাসের শেল ছোড়া হয়, যা জনতার মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটায়।

দেশটির বিরোধী দলগুলো সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে। বিক্ষোভকারী নিহতের ঘটনায় সরকারকে দায়ী করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদ নয়—বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অর্থনৈতিক অসন্তোষ, শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসে তরুণদের এমন সরব উপস্থিতি নজিরবিহীন। সরকার তরুণদের চাওয়া উপেক্ষা করলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে।