মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং টেসলা ও স্পেসএক্স প্রধান ইলোন মাস্কের মধ্যকার প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের ফলে সংকটের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। এ দুই ব্যক্তির দ্বন্দ্বের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট প্রস্তাবে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্পগুলোয় ব্যাপক কাটছাঁট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রশ্নের মুখে পড়ায় এ সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, সমগ্র বৈশ্বিক মহাকাশ গবেষণাই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
হোয়াইট হাউজ থেকে কংগ্রেসে জমা দেয়া প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, নাসার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো হচ্ছে। এতে অন্তত ৪০টি বৈজ্ঞানিক মিশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার অনেকগুলো এরই মধ্যে মহাকাশে সক্রিয় রয়েছে। এসব মিশনের মধ্যে রয়েছে মঙ্গল থেকে পাথরের নমুনা ফেরত আনার কর্মসূচি, রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন রোভার, ভেনাস অভিযান এবং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পৃথিবীর জলবায়ু পর্যবেক্ষণ প্রকল্প।
মার্কিন প্রশাসনের নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সমালোচনা করায় মাস্কের কোম্পানি স্পেসএক্সের সঙ্গে ফেডারেল চুক্তি বাতিলের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। অথচ নাসার বর্তমান কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানের অন্যতম ভিত্তি স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ ও স্টারশিপ রকেট প্রযুক্তি। এর মধ্যে সম্প্রতি তিনটি স্টারশিপ উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হওয়ায় উদ্বেগ আরো বেড়েছে। অন্যদিকে ব্লু অরিজিনের নিউ গ্লেন রকেট এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
নাসার নিজস্ব স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেট প্রতি উৎক্ষেপণে ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার খরচের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে। হোয়াইট হাউজ এ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে বাতিল করে বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি রকেটের ওপর নির্ভর করতে চাচ্ছে। যদিও এসব বিকল্প এখনো সম্পূর্ণ রূপে কার্যকর নয়। বিষয়টির সমালোচনা করে বিশিষ্ট মহাকাশ বিজ্ঞানী ড. সিমিওন বারবার বলেছেন, ‘নাসা হয়তো কড়াই থেকে আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছে।’
নাসার বাজেট কাটছাঁটে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে জলবায়ু পর্যবেক্ষণের স্যাটেলাইট প্রোগ্রামগুলো, যেগুলো পৃথিবীর উষ্ণতা, হিমবাহের গলন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করে। ড. অ্যাডাম বেকার বলেন, ‘এ গবেষণাগুলো ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। এগুলো বন্ধ হলে আমরা কার্যত অন্ধকারে থাকব।’
এ সংকট ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ইএসএর সঙ্গে যুক্ত মিশনগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর ফলে স্থগিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন রোভার পাঠানো এবং মঙ্গল থেকে নমুনা ফেরত আনার প্রকল্প দুটিও। ইউকে স্পেস ফার্ম সারি স্যাটেলাইট টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান প্রফেসর মার্টিন সুইটিং বলেন, ‘এ পরিস্থিতি ইউরোপকে নিজেদের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হতে বাধ্য করবে।’
প্ল্যানেটারি সোসাইটির প্রধান কেসি ড্রেইয়ার মনে করেন, অনেক রিপাবলিকান ব্যক্তিগতভাবে এ বাজেট প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে হয়তো তা অনুমোদন বা বাতিল কোনো কিছুই সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে এ বাজেটই অন্তর্বর্তীকালীনভাবে কার্যকর হয়ে যেতে পারে, যা পরবর্তীকালে পরিবর্তন করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে ড. বারবার বলেন, ‘যা তৈরি করতে দশক লেগেছে, তা এক ঝটকায় ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে এটি পুনর্গঠন করা হবে, তার কোনো পরিকল্পনা নেই।’










