আধুনিক ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (৮৬) তেহরানে স্থানীয় সময় শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম আজ রোববার ভোরে এই খবরটি নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, খামেনি এবং তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য শনিবার সকালে তেহরানে তাদের নিজস্ব কম্পাউন্ডে পরিচালিত এক শক্তিশালী বিমান হামলায় মৃত্যুবরণ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন যে, খামেনি এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেমের নজরদারি এড়াতে পারেননি। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনি যখন ইরানের হাল ধরেন, তখন থেকেই তিনি দেশটিকে এক কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিলেন। খামেনির এই আকস্মিক মৃত্যু কেবল একজন নেতার প্রস্থান নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা এবং অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।

খামেনির মৃত্যুর খবরে তেহরানের রাজপথে ইরানিদের শোক। ছবি- রয়টার্স
খামেনির বেড়ে ওঠা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। ১৯৩৯ সালে মাশহাদের এক ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেয়া খামেনির শিক্ষা শুরু হয়েছিল মাত্র চার বছর বয়সে। তার মা খাদিজাহ মিরদামাদি ছিলেন একজন নিবেদিত কোরআন পাঠক। তিনি তার পুত্রের মাঝে সাহিত্য ও কবিতার প্রতি গভীর ভালোবাসা জাগিয়েছিলেন। দারিদ্র্য ও সরলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা খামেনি মাত্র চার বছর বয়সেই কোরআন শিক্ষা শুরু করেন এবং পরবর্তী জীবনে নাজাফ ও কোম-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। সেখানে তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেনির সান্নিধ্য লাভ করেন।
বিপ্লবের আগে খামেনির জীবন ছিল সংগ্রামের। পাহলভি রাজবংশের স্বৈরশাসন এবং পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে তাকে বারবার কারাবরণ ও নির্বাসনের শিকার হতে হয়েছে। শাহের গোপন পুলিশ বাহিনী সাভাক তাকে ছয়বার গ্রেফতার করেছিল। কিন্তু তিনি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তিনি নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৮১ সালে একটি সংবাদ সম্মেলনে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং তার ডান হাতটি চিরতরে অচল হয়ে যায়। সেই বছরই তিনি ইরানের প্রথম আলেম হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং টানা আট বছর রক্তক্ষয়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দেশকে নেতৃত্ব দেন। এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতাই তার মনে গভীর বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছিল যে, ইরানকে টিকে থাকতে হলে সামরিকভাবে অপরাজিত হতে হবে।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়। খোমেনি যেখানে ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তি গড়েছিলেন, খামেনি সেখানে ইরানকে এক অভেদ্য সামরিক ও কৌশলগত দুর্গে পরিণত করেন। তার শাসনের মূল মন্ত্রই ছিল পশ্চিমাদের প্রতি গভীর অবিশ্বাস এবং ইরানের জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো প্রকার আপস না করা।
শুরুতে খামেনির ধর্মীয় যোগ্যতা নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও তিনি দ্রুতই সামরিক ও বিচারবিভাগের ওপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তার ৩৫ বছরের শাসনামলে তিনি ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান এবং 'ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস' (আইআরজিসি) কে একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করেন। তিনি আইআরজিসিকে একটি সাধারণ আধাসামরিক বাহিনী থেকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। তিনি কেবল ইরানের সীমান্ত রক্ষায় মনোযোগ দেননি, বরং দেশের বাইরেও প্রভাব বিস্তারের জন্য একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ছিল ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধের অক্ষ যা লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনের হুতি এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত একটি ছায়া সামরিক বলয়। এই নেটওয়ার্কের মূল স্থপতি ছিলেন জেনারেল কাসেম সোলাইমানি, যাকে ২০২০ সালে আমেরিকা হত্যা করে। খামেনি বিশ্বাস করতেন, এই প্রক্সি বাহিনীগুলোই হচ্ছে ইরানের ‘আগ্রাসী প্রতিরক্ষা’র প্রধান অস্ত্র, যা ইসরায়েল ও আমেরিকার সম্ভাব্য হামলাকে প্রতিহত করবে।
খামেনির এই ‘প্রতিরোধের রাজনীতি’ কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ‘প্রতিরোধের অর্থনীতি’র ধারণা প্রবর্তন করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানকে স্বনির্ভর করে তোলা। তিনি বারবার পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যেকোনো ধরনের গভীর সম্পৃক্ততার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে, পশ্চিমারা ইরানের উন্নয়ন নয় বরং তার ধ্বংস চায়। ২০১৫ সালে পরমাণু চুক্তিতে (জেসিপিওএ) স্বাক্ষর করা ছিল তার এক বিরল কৌশলগত আপস। কিন্তু ট্রাম্পের সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা খামেনির সেই আদি অবিশ্বাসকেই সত্য বলে প্রমাণ করে। এরপর থেকে তিনি ইরানকে আরো বেশি আগ্রাসী অবস্থানে নিয়ে যান এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৬০ শতাংশে উন্নীত করেন।
তবে খামেনির এই আপসহীন নীতি অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। সমালোচকদের মতে, খামেনি জাতীয় স্বাধীনতার ওপর এতটাই গুরুত্ব দিয়েছিলেন যে তাতে সাধারণ মানুষের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের দাবিগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থেকেছে। ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট, ২০১৯ সালের তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিক্ষোভ এবং ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলো তার প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সৃষ্ট দেশব্যাপী হাহাকার তার ‘প্রতিরোধের অর্থনীতি’র কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। বিশেষত, ট্রাম্পের আমলের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রত্যাহার ইরানকে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ফেলে দেয়। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, খামেনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে সাধারণ ইরানিদের বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। হামাস ও হিজবুল্লাহর দুর্বলতা, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং সবশেষে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলা—খামেনির দীর্ঘদিনের সাজানো ছক ভেঙে পড়তে শুরু করে। মূলত, ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড দিয়ে যে ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতা শুরু হয়েছিল, গত শনিবারের বিমান হামলায় খামেনির মৃত্যু যেন সেই দীর্ঘ সংঘাতের এক চূড়ান্ত পরিণতি।
ট্রাম্প এই সময়টিকে ইরানের জনগণের জন্য ‘মুক্তির সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করলেও, খামেনির অনুসারীদের কাছে তিনি এমন এক প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন যিনি চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা নত করেননি। তার মৃত্যুতে কেবল একজন নেতার প্রস্থান ঘটেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের এক বিশাল রাজনৈতিক দর্শনের অবসান ঘটেছে। তিনি এমন এক সময়ে বিদায় নিলেন যখন তার তৈরি করা 'প্রতিরোধের অক্ষ' এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। ইরানের ইতিহাসে তিনি আজীবন এমন এক নেতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, যিনি চরম একাকীত্ব এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও নিজের দেশের সার্বভৌমত্ব ও ইসলামি আদর্শ রক্ষায় এক চুলও ছাড় দেননি। তার মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেয়ারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।










