লেবাননে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র হামলা ও এলাকা ছাড়ার নির্দেশের পর হাজার হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। আশ্রয়শিবিরগুলোয় স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেককে খোলা আকাশের নিচে বা গাড়িতে রাত কাটাতে হচ্ছে। দেশটির সরকার ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো এ বিশাল সংখ্যক মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। খবর এপি।
বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলির বাসিন্দা ফাতিমা নাঝা তেমনই একজন ভুক্তভোগী। গত দুই দিন ধরে তিনি সপরিবারে রাস্তায় রাত কাটিয়েছেন। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ফাতিমা জানান, সরকার যেসব বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করেছে তার সবগুলোই এখন পূর্ণ। কোনো হোটেল বা ফ্ল্যাট ভাড়া করার সামর্থ্য না থাকায় শেষ পর্যন্ত তারা দেশের বৃহত্তম একটি ফুটবল স্টেডিয়ামে তাবু গেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন। ফাতেমার মতে, এবারের হামলা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র ও অকল্পনীয়।
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১০ দিনে লেবাননের ৮ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এটি দেশটির মোট জনসংখ্যার সাত ভাগের এক ভাগ। অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত লেবানন সরকার মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। বাকিরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১০৩ শিশুসহ সাত শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল হয়ে উঠছে। আগে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বস্তুতে হামলা হলেও এখন তা জনবসতিপূর্ণ সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। বৈরুতের রামলেট এল-বায়দা সমুদ্রসৈকত এলাকায় তাঁবু খাটিয়ে আশ্রয় নেয়া মানুষের ওপরও হামলা হয়েছে, যেখানে গত রাতে অন্তত আটজন নিহত হয়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে এখন কোথাও নিরাপদ বোধ করার সুযোগ নেই।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) লেবানন প্রধান ম্যাথিউ লুসিয়ানো সতর্ক করে বলেছেন, জনগণের প্রয়োজন যে হারে বাড়ছে, ত্রাণ সহায়তা প্রদানের সক্ষমতা তার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। লেবাননের জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়ামে এখন আট শতাধিক মানুষ গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। সেখানে টয়লেটের ব্যবস্থা থাকলেও গোসলের কোনো ব্যবস্থা নেই এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ খুবই অনিয়মিত। সাহায্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তহবিলের অভাবে তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
এ সংকট কেবল লেবাননের নাগরিকদের নয়, দেশটিতে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। ইথিওপিয়া ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা কর্মীরা এখন চার্চগুলোয় আশ্রয় নিচ্ছেন। সীমান্তবর্তী গ্রাম থেকেও মানুষ দলে দলে রাজধানী বৈরুতের দিকে ছুটছেন। সীমান্তে লাখো সৈন্য মোতায়েন থাকায় যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষগুলোর মনে এখন একটাই আশঙ্কা, হয়তো তারা আর কখনোই নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে পারবেন না।









