যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর দুইদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পরিস্থিতি ক্রমে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। খুলছে দোকানপাট। তবে এখনো আতঙ্ক কাটেনি একেবারে ফ্রন্টলাইনে থাকা গ্রামগুলোয়। একেবারে সীমান্ত ঘেঁষা এলাকা থেকে সরে যাওয়া লোকজনকে এখনই গ্রামে ফিরে না যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ রয়ে যেতে পারে—এ আশঙ্কায় তাদের নিজ বাড়িতে ফিরতে মানা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এদিকে যুদ্ধবিরতির পর নিজেদের আকাশসীমা সব ধরনের উড়োজাহাজের জন্য খুলে দিয়েছে পাকিস্তান এয়ারপোর্ট অথরিটি (পিএএ)।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরদিন গতকাল সকাল থেকে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের সড়কে স্বস্তির ভাব দেখা গেছে। খুলতে শুরু করে দোকানপাট। মানুষকে নিত্যদিনের স্বাভাবিক কাজে ফিরতে দেখা যায়। যদিও অনেকে বলছেন এখনো তারা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেননি, আতঙ্ক রয়ে গেছে।
গতকাল জম্মু ও অমৃতসরসহ ভারতের সীমান্তবর্তী শহরগুলোও ছিল পুরো শান্ত। কিছু দোকানপাট সীমিত পরিসরে খুললেও অধিকাংশই ছিল বন্ধ। সাধারণ মানুষকে ঘরের বাইরে খুব একটা দেখা যায়নি। একই অবস্থা দেখা গেছে পাকিস্তান সীমান্তবর্তী নীলম ভ্যালিতেও। উভয় দেশের প্রশাসন সীমান্তবর্তী অঞ্চল ছেড়ে যাওয়া মানুষদের এখনই না ফেরার পরামর্শ দিয়েছে।
ভারতশাসিত কাশ্মীর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুগ্রহ করে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোয় এখনই ফিরবেন না। এখনো অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ রয়েছে, জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে। একই রকম অনুরোধ করা হয়েছে পাকিস্তান প্রশাসনের পক্ষ থেকেও।
বিগত কয়েক দিনের তীব্র গোলাগুলির মধ্যে শত শত মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়। কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। আখনুর এলাকার কৃষি শ্রমিক ২২ বছর বয়সী আশা দেবী বলেন, ‘আমি বিহারে আমার গ্রামে ফিরে যেতে চাই। ওই সীমান্তে গিয়ে মরতে চাই না।’ সীমান্তের কাছের একটি গ্রামের প্রধান কাবাল সিং বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির পর বিস্ফোরণের শব্দ শুনে মানুষ ভীত হয়ে পড়েছে। কেউই বাড়ি ফিরতে চাচ্ছে না।’
পাকিস্তান অংশের নীলম উপত্যকার স্থানীয় প্রশাসন কর্মকর্তা আখতার আইয়ুব জানিয়েছেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের আজ দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। অনেকে পরিস্থিতির অগ্রগতি দেখে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক না কাটার অন্যতম কারণ গতকাল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গোলাগুলির ঘটনা। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর যখন সবার মধ্যে স্বস্তি ফিরছিল, ওই সময় ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের শ্রীনগরে ড্রোন হামলা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর আসে। একইভাবে সীমান্তবর্তী রাজস্থান ও গুজরাটে গোলাগুলি ও ড্রোনের উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও নিয়ন্ত্রণ রেখা সংলগ্ন গ্রামগুলোতে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’-এর অভিযোগ তোলা হয়। উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে। যুদ্ধবিরতির পরও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয়দের আতঙ্ক কাটছে না।
ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত শহর যোধপুরের আইনের শিক্ষার্থী প্রদ্যোত বর্মা বলছেন, ‘আমরা উৎসাহ নিয়ে যুদ্ধবিরতির খবর উদযাপন করছিলাম। কিন্তু আবার ব্ল্যাকআউট, সতর্কতা সাইরেন—সবকিছু যেন আবার শুরু হয়ে গেল।’
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এ যুদ্ধবিরতিকে ‘অস্থায়ী শান্তি’ বলেই আখ্যা দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুমন্ত্র বোস বলেন, ‘এ যুদ্ধবিরতি একটি “ব্যান্ডেজ মাত্র”, যা গভীর ক্ষতকে সাময়িকভাবে ঢাকতে পারে, কিন্তু নিরাময় করবে না।’ তবে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান কিছুটা আশার কথা শোনান। তিনি বলেন, ‘যদিও যুদ্ধবিরতির ব্যত্যয় হয়েছে, তবু এটি উপমহাদেশকে আরেকটি বড় যুদ্ধের মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে।’
সামরিক ইতিহাসবিদ ও কৌশল বিশ্লেষক শ্রীনাথ রাঘবন বলেন, ‘ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারত-পাকিস্তান অধিকাংশ বড় সংঘাত থেমেছে বাইরের হস্তক্ষেপে। তার মতে, উভয় দেশেরই সামরিক উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কম, ফলে বিদেশী অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের হুমকি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।’ রয়টার্স ও নিউইয়র্ক টাইমস।










