বৈশ্বিক পানি চক্র দিন দিন অনিয়মিত ও চরম অস্থির হয়ে উঠছে। এর প্রভাবে পৃথিবীব্যাপী বাড়ছে খরা ও বন্যা। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অর্থনীতি ও জনজীবনে, তৈরি করছে বিভিন্ন সমস্যা। সম্প্রতি বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
পানি চক্র বলতে, পৃথিবীর চারপাশে পানির ঘুরে বেড়ানোর জটিল প্রক্রিয়াকে বুঝায়। ভূমির জলাধার ও নদী থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে উঠে যায়। এরপর সেই জলীয় বাষ্প আবার বৃষ্টি বা তুষার আকারে পৃথিবীতে ফিরে আসে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ‘স্টেট অব গ্লোবাল ওয়াটার রিসোর্সেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন পানির এ চক্রকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। গত বছর বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নদী অববাহিকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা যায়নি। কোথাও খুব বেশি, আবার কোথাও আবার খুব কম পানি- এ দুই অবস্থার মধ্যে দোদুল্যমান ছিল। প্রতিবেদনটিতে নদী, হ্রদ, জলাধার, ভূগর্ভস্থ পানি, বরফ ও তুষারসহ মিঠা পানির সামগ্রিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের প্রধান লেখক এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পানি, হাইড্রোলজি ও ক্রায়োস্ফিয়ার বিভাগের পরিচালক স্টেফান উহলেনব্রুক বলেছেন, ‘গরম আর খরার মাঝেও আমরা একাধিক বন্যা দেখেছি এবং অন্য বছরের তুলনায় বন্যা আরো বেশি হয়েছে। ইউরোপ ২০১৩ সালের পর সবচেয়ে বড় বন্যার শিকার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে হ্যারিকেন হেলেন ভয়াবহ বন্যা এনেছিল, যাতে কমপক্ষে ২৩০ জন মারা যায়। পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় ব্যাপক বন্যা হয়, এতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ মারা যায়।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ বলা হয়েছে, পানির এ অস্থিরতায় শুধু অর্থনীতি ও জনজীবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং বিশ্বের বরফাচ্ছন্ন অঞ্চলও ভুগেছে। টানা তৃতীয় বছরের মতো হিমবাহগুলো বিপুল পরিমাণ বরফ হারিয়েছে। সংখ্যায় বললে, মোট ৪৫০ গিগাটন বরফ গলেছে। এ পরিমাণ বরফের সমান একটি বরফখণ্ড যদি বানানো হয় তবে তা হবে প্রায় ৪.৩ মাইল লম্বা, ৪.৩ মাইল চওড়া এবং ৪.৩ মাইল গভীর। অথবা এ পানি দিয়ে অলিম্পিক গেমসের ১৮ কোটি সুইমিং পুল ভরা যাবে। স্ক্যান্ডিনেভিয়া, আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জ সভালবার্ড এবং উত্তর এশিয়ায় রেকর্ড হারে বরফ গলতে দেখা গেছে।
এদিকে হিমবাহ গলতে থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। একইসঙ্গে যে দেশগুলো বিদ্যুৎ, সেচ বা পানীয় জলের জন্য হিমবাহের ওপর নির্ভরশীল, তারাও বড় হুমকির মুখে পড়ছে।
২০২৪ সাল ছিল পৃথিবীর রেকর্ডকৃত সবচেয়ে উষ্ণ বছর। সে বছর অনেক অঞ্চল পানির অভাবে কষ্ট পেয়েছে। অ্যামাজনের নদীগুলোর পানি স্বাভাবিক স্তরের চেয়ে রেকর্ড পরিমাণ নেমে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে খরা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে এতে শত শত প্রাণীর জীবন হুমকির মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, ওকলাহোমা ও কানসাসে ফসল শুকিয়ে গেছে। উচ্চ তাপমাত্রা বিশ্বের ৭৫টি প্রধান হ্রদের প্রায় প্রতিটিতেই পানির মান খারাপ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ড. উহলেনব্রুক আরো বলেন, ‘অস্থির পানি চক্রের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি হিসাব করা কঠিন। তবে গত বছর একেকটি বন্যাই বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করেছে। পানির প্রাপ্যতা ও সহজলভ্যতার পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাপী উত্তেজনা ও সংঘাতও বাড়াতে পারে।’
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্ট সাওলো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পানি আমাদের সমাজকে টিকিয়ে রাখে, অর্থনীতিকে শক্তি জোগায় এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। অথচ বিশ্বের পানিসম্পদ দিন দিন চাপে পড়ছে। আর পানি সংশ্লিষ্ট চরম দুর্যোগ মানুষের জীবন ও জীবিকায় ক্রমবর্ধমান প্রভাব ফেলছে।’
সূত্র: সিএনন










