কোরিয়া যুদ্ধের ৭৩তম বার্ষিকী উদযাপনকালে সামরিক বাহিনীকে আরো শক্তিশালী করার মাধ্যমে সত্যিকারের শান্তি প্রতিষ্ঠায় মিত্র দেশের প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী হ্যান ডাক-সু। তিনি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক হুমকিগুলো ‘‘‌ কোরিয়া যুদ্ধের’’ পুরনো মানসিকতা ও উপলব্ধির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।’ খবর দ্য কোরিয়া হেরাল্ড।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী হ্যান ডাক-সু গতকাল কোরিয়া যুদ্ধের ৭৩তম বার্ষিকী উপলক্ষে সিউলে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এখনো কোরিয়া যুদ্ধের  বিভ্রম থেকে জেগে উঠতে পারেনি উত্তর কোরিয়া। দেশটি ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও পারমাণবিক পরীক্ষার চলমান হুমকি দিয়ে কোরিয়ান উপদ্বীপের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চাইছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। উত্তর কোরিয়ার মিথ্যা শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতারণামূলক উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে নয়, বরং শক্তিশালী আত্মরক্ষার মাধ্যমে সরকার আমাদের নিরাপত্তা রক্ষা করবে।’

তথ্য বলছে, ৭৩ বছর আগে ১৯৫০ সালে কোরিয়া যুদ্ধ শুরু হয়। ওই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর হঠাৎ করে সশস্ত্র আক্রমণ চালায় উত্তর কোরিয়া। হ্যান ডাক-সু জানিয়েছেন, কোরিয়া যুদ্ধ ১ হাজার ১২৯ দিন স্থায়ী হয়েছিল। এ যুদ্ধে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার দক্ষিণ কোরিয়ার সশস্ত্র বাহিনী প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া ২২টি দেশ নিয়ে গঠিত জাতিসংঘের জোটের অসংখ্য সদস্যের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ২৮ হাজারেরও বেশি ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছে।

এ যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ (পুরুষ, নারী ও শিশু) দুঃখজনকভাবে তাদের জীবন হারিয়েছে, আহত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বিচ্ছেদের যন্ত্রণা সহ্য করেছে। হ্যান ডাক-সু বলেন, ‘১৯৫০ সালের ২৫ জুন সকালে উত্তর কোরিয়ার সশস্ত্র আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হওয়া কোরিয়া যুদ্ধ আমাদের জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। এ যুদ্ধ পুরো দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছে।’

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হচ্ছে উন্মুক্ত গণতন্ত্রের মতো সর্বজনীন মূল্যবোধকে সমর্থন করে এমন দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো।’ এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ইউন-সুক ইওলের যুক্তরাষ্ট্র সফর দক্ষিণ কোরিয়া-মার্কিন জোটকে ‘পারমাণবিক ভিত্তিক নিরাপত্তা জোট’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করেন হ্যান ডাক-সু। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কও ভবিষ্যতে একটি সহযোগিতামূলক সম্পর্কের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাই দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরো শক্তিশালী হবে।’

সিউলে এ অনুষ্ঠানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার প্রদত্ত সাদা ইউনিফর্ম পরিহিত কোরিয়া যুদ্ধের প্রবীণরা এবং কোরিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জাতিসংঘের বাহিনীর পরিবাররাও ছিল। অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল জাতিসংঘের ২২টি রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের মাধ্যমে। অংশগ্রহণকারীদের সমবেত কণ্ঠে কোরিয়া যুদ্ধের গান গেয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট গতকাল তার ফেসবুক পেজে শেয়ার করা এক বার্তায় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাতিসংঘের বাহিনীর নিবেদিত আত্মত্যাগের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘যুদ্ধে প্রবীণ ও তাদের পরিবারের রক্তপাত ও অশ্রুপাত আমরা কখনই ভুলতে পারি না। কোরিয়ার স্বাধীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকারী বীরদের রক্তে দাগযুক্ত সামরিক জামাকাপড়ের গুরুত্ব আমাদের মনে রাখতে হবে।’

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট জানান, জাতিসংঘের ১৯ লাখ ৫০ হাজার সদস্যবিশিষ্ট বাহিনীর মধ্যে ১৭ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন সৈন্য দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছিল। তিন বছর ধরে চলা ওই যুদ্ধে প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার দক্ষিণ কোরিয়ার সৈন্য এবং ১ লাখ ৫০ হাজার জাতিসংঘের বাহিনী, যার মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন সৈন্য নিহত হন।