চলতি বছর স্বর্ণের দামে ঐতিহাসিক উত্থান দেখা গেছে। মূল্যবান ধাতুটির দাম ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং মূল্যবৃদ্ধিতে রেকর্ড উচ্চতা অতিক্রম করেছে ৫০ বারেরও বেশি। ফলে এখন বিনিয়োগকারীরা হিসাব কষছেন, স্বর্ণের বাজারদরের ঊর্ধ্বমুখী ধারা কি ২০২৬ সালেও বজায় থাকবে। খবর ইউরো নিউজ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছর স্বর্ণের দাম দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রেখেছে কয়েকটি বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার কমানো ও ডলারের দুর্বল বিনিময় হার। এসবের সম্মিলিত কারণে নিরাপদ ও আপৎকালীন বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণে আগ্রহ আরো বেড়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধাতুটির ধারাবাহিক ক্রয় চাহিদাও বেড়েছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিই বছরজুড়ে স্বর্ণের দাম বাড়িয়েছে অন্তত ১২ শতাংশীয় পয়েন্ট। মূল্যবৃদ্ধিতে ডলারের দুর্বল বিনিময় হার ও সুদহার হ্রাস; বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তগত অবস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিস্যা যথাক্রমে ১০, ৯ ও ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট। কভিড-১৯ মহামারী-পূর্ব সময়ের তুলনায় সরকারি পর্যায়ে মূল্যবান ধাতুটির ক্রয় চাহিদা অনেক বেশি।

২০২৬ সালের পূর্বাভাসে ডব্লিউজিসি জানিয়েছে, চলতি বছর স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধিতে যেসব বিষয় ভূমিকা রেখেছে, এর অনেকটাই আগামী বছরেও থাকবে। তবে আগামী বছরের শুরুতেই পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। বাজারে এখন স্থিতিশীল বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার সামান্য কমে আসা ও মোটামুটি স্থির ডলারের বিনিময় হারের মতো বিষয়গুলো আগেই মূল্যায়িত হয়েছে। এ কারণে স্বর্ণের বর্তমান দাম তখন মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ পর্যায়ে থাকবে। অর্থাৎ ধাতুটির দাম ৫ শতাংশ কম থেকে শুরু করে ৫ শতাংশ বৃদ্ধিসীমার মধ্যে ওঠানামা করতে পারে।

তবে তিনটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দামে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। যদি বৈশ্বিক অর্থনীতি দুর্বল হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র আরো সুদহার কমায়, তাহলে স্বর্ণের দাম ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর যদি অর্থনৈতিক মন্দা গভীর হয়, তাহলে নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা দ্রুত বাড়বে। সেক্ষেত্রে স্বর্ণের দাম ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শক্তিশালী হলে এবং ডলারের বিনিময় হার যদি শক্তিশালী হয় তাহলে ধাতুটির দাম কমতে পারে ৫ থেকে ২০ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান বলছে, স্বর্ণের দাম আগামী বছর ৫ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৩০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাকস বলছে, ধাতুটির দাম প্রায় ৪ হাজার ৯০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

অন্যদিকে ডয়চে ব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৯৫০ থেকে ৪ হাজার ৯৫০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে। মরগান স্ট্যানলি বলছে, দাম ৪ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছি থাকতে পারে, যদিও স্বল্পমেয়াদে অস্থিরতার ঝুঁকি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালে বা মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে ফেড সুদহার কমানো পিছিয়ে দিতে পারে। এতে ডলার শক্তিশালী হবে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণ কেনার আগ্রহ কিছুটা কমতে পারে। স্বর্ণনির্ভর ইটিএফে বিনিয়োগ কমে গেলে বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ কেনা কমালে বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। এছাড়া ভারতসহ কিছু দেশে পুনর্ব্যবহৃত স্বর্ণ সরবরাহ বাড়লে তাও দামে প্রভাব ফেলতে পারে।