সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর গাজায় পুনরায় হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। এর আগেই হামাসের ঘাঁটি ধ্বংসের কারণ দেখিয়ে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে আল-মাওয়াসি অঞ্চলে সরে যেতে বলে।

বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়, আশ্রয়ের জন্য ইসরায়েলের দেখিয়ে দেয়া অঞ্চলটি আয়তনে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের চেয়েও ছোট। সেখানে রয়েছে মানবিক পরিষেবার তুমুল সংকট।

গত ৭ অক্টোবর গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করে আইডিএফ। এরপর থেকে ফিলিস্তিনিদের একেক সময় একেক দিকে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে আসছে।

ইসরায়েল গত ১৮ অক্টোবর ‘মানবিক অঞ্চল’ হিসেবে আল-মাওয়াসির নাম উল্লেখ করেছিল। আইডিএফের এক মুখপাত্র মাইক্রো ব্লগিং প্লাটফর্ম এক্সে এক বার্তায় এ অঞ্চলের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা প্রদানেরও আশ্বাস দেন।

এরপর ২১ অক্টোবর ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হয়, যদি জীবনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তাহলে আমরা আপনাকে মাওয়াসি যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।

তবে গাজার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নিরাপদ আশ্রয়ের ক্ষেত্রে আইডিএফ বারবার ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছে। একেক সময় তাদের একেক স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। এতে বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, আল-মাওয়াসি ভূমধ্যসাগরের তীরে সরু একফালি মরুভূমি। এখানে আছে কিছু বালুর টিলা ও কৃষি জমি। সঙ্গে হাতে গোনা কয়েকটি ভবন। যার আয়তন মাত্র ৮ দশমিক ৫ বর্গ কিলোমিটার।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এলাকাটিতে আশ্রয় নেয়া রিম আবদ রাবু মাটিতে ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। তিনি চারটি পরিবারের সঙ্গে একটি তাঁবু ভাগাভাগি করছেন।

রিম বলেন, আল-মাওয়াসি একটি পরিত্যক্ত জায়গা, ‘মানুষের জন্য নয়’। ভেবেছিলেন যে তীব্র বোমাবর্ষণ ও যুদ্ধ থেকে এলাকাটি নিরাপদ হবে। কিন্তু এখানে এসে কোনো মৌলিক পরিষেবা খুঁজে পাননি। বলেন, পানি একদিন আসে তো পরের ১০ দিন আসে না। এমনকি বাথরুমেও আসে না। বিদ্যুতেরও একই অবস্থা।

আল-মাওয়াসিতে পালিয়ে আসা মোনা আল-আসতাল একজন চিকিৎসক। প্রতিবেশীর বাড়িতে বোমা হামলার পর খান ইউনিস ছেড়ে আসতে বাধ্য হন। তিনি জানান, মানবিক অঞ্চল বলা হলেও পানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সরবরাহের তীব্র অভাব রয়েছে। ৩০০ ডলার খরচ করে একটি তাবু ও অন্যান্য জিনিস কিনতে বাধ্য হন বলেও জানান মোনা।

শুধু খাবার বা পানিরই সংকট নয়, এরই মধ্যে নানান ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। মোনা জানান, উকুন, চিকেন পক্স ও অন্ত্রের সংক্রমণসহ বেশ কিছু রোগ ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের অবস্থা হয়ে উঠেছে নাজুক।

যুদ্ধ ও বিমান হামলার বিস্তৃত পরিসরের কারণে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গাজার মানবিক অঞ্চলের কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত নভেম্বরের মাঝামাঝিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছিল, আল-মাওয়াসির পরিকল্পনা হলো ‘বিপর্যয়ের রেসিপি’।

ডব্লিউএইচও প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেন, এত অল্প পরিষেবায় এত বেশি লোককে এত ছোট এলাকায় রাখার চেষ্টা স্বাস্থ্যের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। তারা এরই মধ্যে এ ঝুঁকির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

জাতিসংঘও এই পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থার মানবিক বিষয়ক সমন্বয় অফিসের প্রধান (ওচা) আন্দ্রেয়া ডি ডোমেনিকো বলেন, গাজার কোথাও নিরাপদ জায়গা নেই। একতরফাভাবে ঘোষিত নিরাপদ অঞ্চল বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করতে পারে না।

এদিকে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা বেড়ে ১৭ হাজার ৪৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪৬ হাজার ৪৮০ জন। গতকাল শুক্রবার গাজায় হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল-কুদরা এ তথ্য দেন। এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শুধু গত কয়েক ঘণ্টায় ৩৫০ জন নিহত ও ৫৫৮ জন আহত হয়েছেন। আরো অনেক লোক ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন।