বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো একটিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড গড়ার আশঙ্কা ৮০ শতাংশ। এতে চরম খরা, ভয়াবহ বন্যা ও দাবানলের ঝুঁকিও তীব্রভাবে বাড়বে বলে সতর্ক করেছে তারা।
ডব্লিউএমওর মাঝারি মেয়াদের নতুন এক জলবায়ু পূর্বাভাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হওয়ার আশঙ্কা ৭০ শতাংশ। অথচ প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রধান লক্ষ্যই ছিল এই গড় উষ্ণতা সীমার মধ্যে রাখা। যদিও এই লক্ষ্য ২০ বছরের গড় ভিত্তিতে নির্ধারিত, তবুও নতুন তথ্য সেই সীমা ভেঙে পড়ার আশঙ্কাকে অনেক বেশি বাস্তব করে তুলেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো একটি বছরে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা ৮৬ শতাংশ, যা ২০২০ সালের পূর্বাভাসে ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। এমনকি ২০২৪ সালেই প্রথমবারের মতো এই সীমা বাৎসরিক ভিত্তিতে অতিক্রম করেছে। আর এই বছরই ছিল ১৭৫ বছরের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে উষ্ণতম বছর।
প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের আগেই ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা অতিক্রম করার আশঙ্কা এখন ১ শতাংশ। যদিও এটি তুলনামূলকভাবে কম, তবে বিজ্ঞানীদের মতে—এমন পূর্বাভাস আগে কখনো দেয়া হয়নি। এই মাত্রার উষ্ণতার জন্য এল নিনো, ইতিবাচক আর্কটিক অসিলেশনসহ একাধিক প্রাকৃতিক উষ্ণায়নকারী উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবের প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের বিজ্ঞানী আদাম স্কাইফ বলেন, ‘২ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা পরিসংখ্যানগতভাবে সম্ভব হয়ে উঠেছে—এ তথ্য সত্যিই চমকে দেয়ার মতো। এখন এর সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ হলেও ভবিষ্যতে পৃথিবী যত উষ্ণ হবে, ততই এই ঝুঁকি বাড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে এই উষ্ণতা সমানভাবে প্রভাব ফেলবে না। আর্কটিক অঞ্চলে শীতকালে গড় উষ্ণতা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৫ গুণ দ্রুত বাড়বে। বরফ গলে গিয়ে তুষার সরাসরি সমুদ্রে পড়ায় সূর্যের আলো প্রতিফলনের বদলে তা শোষিত হচ্ছে—ফলে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে, অ্যামাজন অঞ্চলে বাড়তে পারে খরার প্রবণতা। দক্ষিণ এশিয়া, সাহেল অঞ্চল এবং উত্তর ইউরোপে (যুক্তরাজ্যসহ) বাড়তে পারে বৃষ্টিপাত।
এই পূর্বাভাস তৈরি করতে বিশ্বের ১৫টি প্রতিষ্ঠানের ২২০টি জলবায়ু মডেল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অংশ নিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেট অফিস, বার্সেলোনা সুপারকম্পিউটিং সেন্টার, কানাডার জলবায়ু বিশ্লেষণ কেন্দ্র এবং জার্মানির আবহাওয়া বিভাগ। প্রতিবেদনটির প্রধান গবেষক, মেট অফিসের লিওন হারম্যানসন। তিনি জানিয়েছেন, ২০২৫ সাল হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ তিনটি বছরের একটি।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার জলবায়ু পরিষেবাবিষয়ক পরিচালক ক্রিস হিউইট বলেন, ‘এই প্রতিবেদন মানবস্বাস্থ্য ও উষ্ণতার দিক থেকে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। তবে এখনো সময় আছে পদক্ষেপ নেয়ার।’










