লেবাননে সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ। বুধবার শুরু হওয়া ৬০ দিনের এ যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স। ১৪ মাস ধরে আন্তঃসীমান্ত হামলা চলছে। ইসরায়েলি বাহিনীর ভারী হামলায় দক্ষিণ লেবানন, বেকা উপত্যকা ও বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলি দাহিয়েহে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার দুই মাস পর এ ঘটনা ঘটল। কিন্তু চুক্তি শুরু হওয়ার পর পরই উভয় পক্ষ থেকে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঠিক কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে তা নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। খবর আল জাজিরা।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, হিজবুল্লাহকে দক্ষিণ লেবানন ত্যাগ করে লিতানি নদীর উত্তরে যেতে হবে। এদিকে ইসরায়েল ব্লু লাইনের দক্ষিণে ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা লেবানন ও ইসরায়েলকে পৃথক্কারী সীমান্ত। লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী (এলএএফ) জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের পাশাপাশি দক্ষিণে নজরদারি করার জন্য মোতায়েন করা হবে লেবাননে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন বাহিনী (ইউএনআইএফআইএল)।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির ২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ইসরায়েল লেবাননের ভূখণ্ডের ভেতরে আক্রমণাত্মক অভিযান চালাবে না এবং লেবানন সরকার হিজবুল্লাহ বা অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ইসরায়েলে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখবে। তবে লেবাননের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি হামলার বেশ কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো নিকোলাস ব্ল্যানফোর্ড আল জাজিরাকে বলেন, ‘টেকনিক্যালি মনে হচ্ছে ইসরায়েলিরা এরই মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে গুলি চালিয়ে ২ নম্বর ধারা ভঙ্গ করেছে। ইসরায়েল রেড জোন চিহ্নিত একটি মানচিত্র প্রকাশ করে দক্ষিণ লেবাননে চলাচল সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। ওই এলাকার লোকজনকে তাদের বাড়িতে ফিরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বিষয়টি যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ নয়।’
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী একটি গাড়িতে থাকা লোকজনকে সন্দেহভাজন আখ্যা দিয়ে বৃহস্পতিবার গুলি চালায়। ইসরায়েল দাবি করেছে যে এ সন্দেহভাজনরা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ বলেছে যে নিজ বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের ওপর আক্রমণ করেছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের এ লঙ্ঘনের ঘটনায় হিজবুল্লাহর নেতারা নিন্দা জানালেও গোষ্ঠীটি কোনো ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত থেকেছে। শুক্রবার গোষ্ঠীটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর হিজবুল্লাহ এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিজয় ঘোষণা করে। বৃহস্পতিবার হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জনের ঘোষণা দিয়ে বলেছে, বিভ্রান্তিকর শত্রু তাদের সংকল্প বা ইচ্ছা ভঙ্গ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্ট প্রায়ই হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন। উদ্দেশ্যটি পুরোপুরি অর্জন না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
তার পরও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির আগের শেষ কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে যায়। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ উভয়ই সমঝোতা করেছে বলে মনে হচ্ছে। যদিও হিজবুল্লাহ টিকে আছে এবং রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ক্ষমতা বজায় রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহ বিজয় দাবি করলেও এর মূল্য দিতে হয়েছে গোষ্ঠীটির জন্য। কারণ তাদের ক্ষমতা ও প্রভাবের কিছু সীমা মেনে নিতে হয়েছে। কোনো পক্ষই সম্পূর্ণ জয় অর্জন করতে পারেনি এবং উভয়কেই যুদ্ধবিরতি ধরে রাখার জন্য ছাড় দিতে হয়েছে।
লেবাননের অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে তাদের বাড়িঘর ও জীবন পুনর্নির্মাণে মনোনিবেশ করায় বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এখন হিজবুল্লাহর প্রতিশোধ নেয়ার সময় নয়। হিজবুল্লাহর এখন অগ্রাধিকার হবে তার সম্প্রদায়ের কল্যাণ এবং সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন।










