আধুনিক যুগের বিস্ময় বলতে যদি কিছু বোঝায়, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে ফ্লোরিডার দক্ষিণ উপকূল থেকে কিজ দ্বীপপুঞ্জের দিকে প্রসারিত ১৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ওভারসিজ হাইওয়ে’। আটলান্টিক মহাসাগর আর উপসাগরের নীল জলের মাঝে, ৪২টি সেতুর ওপর ভর করে ৪৪টি ট্রপিক্যাল দ্বীপের বুক চিরে চলে যাওয়া এ রাস্তাটি যেন এক অদ্ভুত জাদুকরী যাত্রা।
মায়ামি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত কী ওয়েস্ট পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে যাওয়া এখন যেমন স্বপ্নের মতো, একসময় এটি ছিল অসম্ভব। ২০ শতকের শুরুর দিকে কেবলমাত্র নৌকায় দীর্ঘ সময় ধরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে এ দ্বীপে পৌঁছানো যেত। কিন্তু শিল্পপতি হেনরি ফ্ল্যাগলার তার দূরদর্শী পরিকল্পনায় দৃশ্যপট বদলে দেন। ফ্ল্যাগলার স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, তাকে ‘মডার্ন ফ্লোরিডা’র জনকও বলা হয়ে থাকে।
ফ্লোরিডার পর্যটন সম্ভাবনা দেখে তিনি ১৮৮৫ সালে জ্যাকসনভিল থেকে মায়ামি পর্যন্ত শুরু করেন রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ। ১৯০৪ সালে পানামা খালের নির্মাণ শুরুর খবরে তিনি কী ওয়েস্টকে বাণিজ্যিক হাব হিসেবে কল্পনা করেন, যেহেতু এটি খালের সবচেয়ে কাছের মার্কিন ভূখণ্ড ও দক্ষিণ-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রের গভীরতম বন্দর।
এ অসম্ভব কাজ সম্পন্ন করতে খরচ হয় প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার (বর্তমান মূল্যে ১ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন)। সময় লাগে সাত বছর, আর এতে কাজ করেন প্রায় ৪ হাজার আফ্রিকান-আমেরিকান, বাহামিয়ান ও ইউরোপীয় অভিবাসী শ্রমিক। কুমির, বিষাক্ত সাপ আর মশার ভয়ে ভরা পরিবেশে যারা কাজ করতেন।
১৯১২ সালে রেললাইন চালু হলে একে বলা হয় ‘বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য’। এ ঐতিহাসিক যাত্রায় ৮২ বছর বয়সী ফ্ল্যাগলার নিজে ছিলেন। স্নপ্ন পূরণের খুশিতে সে সময় তিনি বলেন, ‘এখন আমি শান্তিতে মরতে পারি।’
১৯৩৫ সালে এক ভয়াবহ হারিকেনে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে, সেটিকে রূপান্তর করা হয় হাইওয়েতে। ১৯৩৮ সালে যাত্রা শুরু হয় ওভারসিজ হাইওয়ের, যা ফ্ল্যাগলারের বহু সেতুকে ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়। এর মাধ্যমে কীস দ্বীপপুঞ্জ পরিণত হয় যুক্তরাষ্ট্রের এক জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে।
আজও সেই ২০টি সেতু বহন করে চলেছে হাজার হাজার পর্যটককে। যাত্রাপথে চোখে পড়ে কী লার্গো, ইসলামোরাডা, পিজন কী’র মতো জায়গা।
এ রেলপথ আর হাইওয়ের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযোগ গড়ে ওঠে কীস-এর মতো এক দূরবর্তী জায়গার। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল ‘ফ্লোরিডা কীসের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা’—যা অঞ্চলটির অর্থনীতি ও পর্যটনের গতিপথ একেবারে বদলে দেয়।










