শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল ফিলিস্তিন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এ অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনের আওতায় আসে, যা ‘প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেট’ নামে পরিচিত। সেসময় ইউরোপে বেড়ে ওঠা ইহুদিবিদ্বেষের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশরা সেখানে ইহুদিদের জন্য ‘জাতীয় আবাসভূমি’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়।
এরপর ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে ইউরোপে ইহুদি নিপীড়নের কারণে হাজার হাজার ইহুদি শরণার্থী প্যালেস্টাইনে প্রবেশ করে। এতে উত্তেজনা বাড়ে, ব্রিটিশ শাসনের শেষদিকে অঞ্চলটি এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে দুটি ভাগে ভাগ করে ইহুদি ও আরব রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেয়। ইহুদিরা এই প্রস্তাব মেনে নেয়, কিন্তু ফিলিস্তিনি ও আরব রাষ্ট্রগুলো এটিকে ন্যায়সঙ্গত মনে করেনি—কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর জমি সংখ্যালঘুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল।
১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষিত হওয়ার পরপরই শুরু হয় প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ছত্রছায়ায় সংঘটিত হয় ইতিহাসের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। ধ্বংস হয় পাঁচ শতাধিক গ্রাম, বাস্তুহারা হয় প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনি, বহু মানুষ হত্যা ও ধর্ষণের শিকার হন। সংঘাত শেষে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ৪০ শতাংশ ভূমি দখল করে। এই গণচ্যুতি—এই জাতিগত নির্মূল—ইতিহাসে ‘নাকবা’ নামে চিহ্নিত হয়ে ওঠে। যার অর্থ মহাবিপর্যয়।
৭৬ বছর কেটে গেছে। কিন্তু ইতিহাস থেমে নেই। চলমান ক্ষতে পরিণত হয়েছে নাকবা। যে ঘরগুলো ফিলিস্তিনিরা পেছনে রেখে পালিয়েছিলেন, ফিরে যাওয়ার প্রতিজ্ঞায় সেগুলোর দরজার চাবি আজো অনেকে আগলে রেখেছেন বংশপরম্পরায়।
গাজা উপত্যকা এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এবং অবরুদ্ধ এলাকাগুলোর একটি। ২০ লাখের বেশি মানুষ এখানে বন্দি জীবনযাপন করছে—বিদ্যুৎ, পানি, ওষুধ, এমনকি খাদ্যের অভাবে প্রকট। শিশুদের ৪০ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছে। যে ফিলিস্তিনিরা ১৯৪৮ সালে উদ্বাস্তু হয়েছিলেন, তাদের উত্তরসূরীদের সংখ্যা এখন ৭০ লাখের বেশি। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। লেবানন, জর্ডান, সিরিয়া—এসব দেশের শরণার্থী শিবিরে জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম, যাদের কোনো রাষ্ট্র নেই, পাসপোর্ট নেই, নাগরিকত্ব নেই।
ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে বিশ্বজুড়ে সমর্থন রয়েছে। এর পক্ষে রয়েছে জাতিসংঘের দুটি রেজল্যুশন ও একটি কনভেনশন। তবে ইসরায়েল এই ফিরে যাওয়ার অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাঁদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে ইসরায়েলের একটি ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে পরিচয় বিলুপ্ত হবে।
গত ৭৭ বছরে এই সংকটের সমাধানে অনেক প্রস্তাব এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হচ্ছে ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন, দুটি রাষ্ট্র জেরুজালেমকে দুটি রাজধানীতে ভাগ করে নেবে।
তবে দিন যত গড়াচ্ছে উভয় পক্ষই এই সমাধানের বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর ফিলিস্তিনিদের জন্য নাকবা হয়ে উঠছে রোজকার ঘটনা।










