ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনে অ্যামাজন রক্ষার জোরালো প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে বৈষম্য, অগ্রগতির ঘাটতি ও স্থানীয় আদিবাসীদের প্রতি দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে কোনো বাস্তব আলোচনা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন অ্যামাজনকেন্দ্রিক আদিবাসীরা। আদিবাসী ভূখণ্ডের সীমানা নির্ধারণ ও নদীকে বাণিজ্যিক রুট হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়েছে তারা।
সবশেষ শুক্রবার সম্মেলনস্থলের প্রধান প্রবেশপথ অবরোধ করে বিক্ষোভে অংশ নেন অ্যামাজনের মুন্ডুরুকু, পানকারারু, কিচওয়াসহ বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী। তাদের মতে, আয়োজক দেশ ব্রাজিল যতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক কপ আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। যদিও তারা সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন, কিন্তু অ্যামাজন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা মূলত নামমাত্র ও প্রতীকী। বিক্ষোভে উপস্থিত আদিবাসীরা বলেন, প্রকৃতপক্ষে যাদের ওপর অ্যামাজন রক্ষার দায়িত্ব, আলোচনার টেবিলে তাদের মতামতই উপেক্ষিত থাকছে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অ্যামাজন এলাকায় কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ সম্প্রসারণ, নদী বাণিজ্যিকীকরণের পরিকল্পনা, জ্বালানি তেল উত্তোলন ও খনন—এসব কার্যক্রম বনকে স্থায়ী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তাদের দাবি, আদিবাসী ভূখণ্ডের সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করতে হবে, নদীকে বাণিজ্যিক রুট হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা বাতিল করতে হবে এবং বন ধ্বংসের বিনিময়ে কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। মুন্ডুরুকু নেতারা প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলার সঙ্গে জরুরি বৈঠকের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের বন বিক্রির জন্য নয়। আমরা জলবায়ুর রক্ষক। মুনাফার জন্য আমরা অ্যামাজন ধ্বংস হতে দেব না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, আদিবাসীদের এ বিক্ষোভ গত তিন দশকের জলবায়ু আলোচনার অকার্যকরতার প্রতিফলন। জলবায়ু নীতি বিশেষজ্ঞ হারজিত সিং এপিকে বলেন, ‘গত তিন দশকে জলবায়ু আলোচনার কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। যারা জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যের প্রকৃত রক্ষক, তারা এখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার বাইরে।’
কনফারেন্সের ভেতরেও বারবার প্রশ্ন উঠেছে, কপ কি সত্যিই কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্লাটফর্ম, নাকি ধনী দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা? বিশ্লেষকদের মতে, এ সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি লবিস্টদের উপস্থিতি বেড়েছে, প্রতিশ্রুত অর্থায়ন যথাস্থানে পৌঁছাচ্ছে না এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না। এ অবস্থায় ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বিশ্ব উষ্ণায়নকে শিল্পায়ন-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার লক্ষ্য অর্জনও কঠিনতর হয়ে উঠেছে।
সম্মেলনের বাইরে বিক্ষোভের পাশাপাশি ভেতরের সাইড ইভেন্টগুলোতেও অ্যামাজন নিয়ে উদ্বেগের সুর শোনা গেছে। একুয়েডর ও ব্রাজিলের অ্যামাজন অঞ্চলের নেতারা জানিয়েছেন, তেল উত্তোলন, খনন, কৃষির সম্প্রসারণ এবং করপোরেট প্রকল্পগুলো অ্যামাজনকে স্থায়ী ক্ষতির দিকে
ঠেলে দিচ্ছে। কিচওয়া নেতা লিওনার্দো সেরদা বলেন, ‘নাপো নদী থেকে অ্যামাজন পর্যন্ত তিন হাজার কিলোমিটারের যাত্রায় আমি দেখেছি কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির শিল্প আমাদের মানুষ ও পরিবেশকে ধ্বংস করছে।’
তবে কপ৩০ সম্মেলনের সিইও অ্যানা টনি দাবি করেছেন, এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক কপ সম্মেলন, যেখানে ৯০০ জনের বেশি আদিবাসী প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের কথা শুনছি।’ আর আদিবাসীরা বলছেন, শুধু শুনলেই হবে না, বরং জলবায়ু নীতিনির্ধারণেও তাদের মতামতের প্রভাব রাখতে হবে।
সার্বিকভাবে কপ৩০ সম্মেলনে জলবায়ু পরিস্থিতি নিয়ে আশা ও হতাশা সমান্তরালে প্রতিফলিত হয়েছে। অ্যামাজন রক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি ধীরগতিতে এগোচ্ছে। বৈষম্য, কার্যকারিতার ঘাটতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সীমাবদ্ধতার কারণে আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের ভূখণ্ড, সাংস্কৃতিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।










