ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বিভিন্ন মর্গে প্রতিদিনই আসছে মৃতদেহ। কখনো কখনো সে সংখ্যা দুই অংকেও পৌঁছাচ্ছে। ১৫ মাসের বিধ্বংসী যুদ্ধে যেসব ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে এসব মৃতদেহ উদ্ধার করে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি এমন যুদ্ধক্ষেত্র থেকেও মৃতদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে, যেখানে আগে উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছানো খুবই বিপজ্জনক ছিল। খবর এপি।

গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে গাজায় অনেক মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে। এতদিন এ মানুষগুলো ‘নিখোঁজ’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। কারণ তাদের মৃত্যু আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন হয়নি। যুদ্ধের কারণে স্থানচ্যুত হওয়া তাদের পরিবার বা প্রিয়জনদের কী হয়েছে, তা জানতে না পেরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। তাদের ক্ষেত্রে গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে তালিকাভুক্ত করার পরিবর্তে বিপজ্জনক স্থানে ধসে পড়া ভবনের নিচে বা অন্য কোথাও রয়েছে উল্লেখ করে নোট রেখেছে।

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে রোববার একটি চুক্তির ফলে শতাব্দীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়। এর পর থেকে পুরো এলাকাজুড়ে প্রিয়জনদের খুঁজে বের করতে তাদের পরিবারের সদস্যদের ছোটাছুটি করতে দেখা যায়।

ফিলিস্তিনিরা ভিড় জমিয়েছে ধ্বংসস্তূপের কাছে, যেখানে এক সময় তাদের বাড়িঘর ছিল। তারা উদ্বেগের সঙ্গে উদ্ধার কর্মীদের নিখোঁজ মৃতদেহ খুঁজতে ধ্বংসস্তূপ সরাতে দেখছে। যুদ্ধবিরতির পর থেকে প্রতিদিন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৫০-১২০টি উদ্ধার করা মৃতদেহ নথিভুক্ত করছে।

সাক্ষাৎকারে গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহের আল-ওয়াহিদি জানান, পরিবারের কাছ থেকে নিখোঁজ প্রিয়জনদের বিষয়ে পাওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিখোঁজ ও এখনো উদ্ধার না হওয়া মৃতদেহের সংখ্যা প্রায় আট হাজার।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরায়েল ও হামাস সংঘাত শুরু ১৫ মাসের বেশি সময় পেরিয়েছে। ফলে এ সময়ের মধ্যে নিখোঁজ ও মৃতের সংখ্যা পুরোপুরি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।

উদ্ধারকারী দল, বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ৪৭ হাজার ২৮৩ (গত শুক্রবার পর্যন্ত), যা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম। এ প্রতিবেদনে সাধারণ নাগরিক ও যোদ্ধাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। ইসরায়েলের দাবি, হামাস আবাসিক এলাকায় অবস্থান নেয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর দায় তাদের।

গত বুধবার রাফার প্রধান ফরেনসিক কেন্দ্রে কর্মকর্তারা মৃতদেহ ও ছোট ছোট দেহের অংশগুলো সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়িয়ে মাটিতে রাখছিলেন। ভেতরে এক ব্যক্তি তার প্রিয়জনকে শনাক্ত করতে এসে হাড়ের স্তূপ দেখে হতবাক হয়ে যান। তিনি একটি স্কার্ফ ও জুতা চিনতে পারেন, যা তার পরিবারের একজন সদস্যের ছিল। তবে ঠিক কার, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছিলেন না। তিনি এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে কথা বলতে পারছিলেন না। কষ্টে তিনি নিচু হয়ে এক হৃদয়বিদারক আর্তনাদ করেন।

তদন্তকারীরা সবুজ মার্কার দিয়ে ব্যাগগুলোর ওপর নাম লিখেছেন। যদি মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করা না যায়, তাহলে তারা ব্যাগে সংখ্যা লিখেছেন। তাদের প্রত্যাশা, একদিন গাজায় ডিএনএ পরীক্ষা চালু হবে। যার মাধ্যমে মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া যাবে।

রাফার ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. আহমেদ জুহাইর বলেছেন, ‘আমরা নম্বরযুক্ত ব্যাগগুলো একটি বিশেষ স্থানে রাখি, যাতে মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতে সেগুলো শনাক্ত করতে পারে। আমাদের যা করার, তা হলো শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করা।’