গত চার বছরে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ ধনীর সম্পদ ফুলেফেঁপে উঠেছে। একদিকে তাদের বিত্ত দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে দরিদ্রদের আয় কমেছে। দাতব্য সংস্থা অক্সফাম এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করে কর নীতির ওপর অতি ধনীদের প্রভাব প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এবারের আসর বসার আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২০ সালে এ ধনীদের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। গত বছর তা ৮৬ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে।

গবেষণা সংস্থা ওয়েলথ এক্সের তথ্য ব্যবহার করে জানা যায়, বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ ধনী ব্যক্তি ইলোন মাস্ক, বেহনা আহনোঁ, জেফ বেজোস, ল্যারি এলিসন ও মার্ক জাকারবার্গের সম্মিলিত সম্পদ ৪৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বা ১১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ অর্থাৎ দরিদ্রতম ৪৭৭ কোটি মানুষে মোট সম্পদ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ স্টক, শেয়ার ও বন্ডসহ ব্যক্তিগতভাবে অংশীদারিত্বসব বৈশ্বিক আর্থিক সম্পদের ৫৯ শতাংশের মালিক। যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ সব আর্থিক সম্পদের সাড়ে ৩৬ শতাংশের মালিক, যার মূল্য ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন পাউন্ড।

চলতি দশকের শুরুর দিকে সারা বিশ্বে কভিড-১৯ মহামারী আঘাত হানে। বৈশ্বিক অর্থনীতির এ খারাপ সময়েও বিলিয়নেয়াররা ২০২০ সালের সালের তুলনায় ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে।

আজ সোমবার (১৫ জানুয়ারি) সুইস আলপাইন রিসোর্টে এ সম্মেলন শুরু হচ্ছে। বরাবরের মতো এর আগের দিনই বিশ্বব্যাপী বৈষম্যের ওপর অক্সফামের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

দাভোসে রাজনৈতিক নেতা, করপোরেট নির্বাহী ও অতি ধনীরা বার্ষিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে জড়ো হয়েছেন।

বিশ্বব্যাপী বৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অক্সফাম বলেছে, শেয়ারের দাম বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলো অনেক বেশি সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জন করেছে। এ ক্ষমতা করপোরেটগুলো অসাম্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করে। তারা শ্রমিক ঠকিয়ে, কর ফাঁকি দিয়ে নিজেদের পকেট ভর্তি করে, রাষ্ট্রকে আরো বেসরকারীকরণের দিকে ঠেলে দেয়।

করপোরেশনগুলোকে সুদূরপ্রসারী পরিণতিসহ ‘টেকসই ও অত্যন্ত কার্যকরীভাবে’ বৈষম্য টিকিয়ে রাখার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হচ্ছে, একচেটিয়া ক্ষমতা মজুরি, খাদ্যমূল্য ও ওষুধের ওপর প্রভাব তৈরি করেছে।

অক্সফাম বিদ্যমান কর কাঠামোর সমালোচনা করে জানায়, এতে কম কর দেয়ার সুযোগ পায় করপোরেটরা। অথচ এ অর্থ সমাজের সবচেয়ে দরিদ্রদের সহায়তায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওইসিডি দেশগুলোতে করপোরেট কর উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ১৯৮০ সালের ৪৮ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে কমে হয়েছে ২৩ দশমিক ১ শতাংশ।

ভারসাম্যহীনতা মোকাবেলার জন্য, অক্সফাম বিশ্বের কোটিপতি ও বিলিয়নেয়ারদের ওপর সম্পদ ট্যাক্সের আহ্বান জানিয়েছে। যা প্রতি বছর ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার আনতে পারে বলে।

দাতব্য সংস্থাটি সিইওদের বেতন সীমাবদ্ধ করার ও একচেটিয়া ক্ষমতা ভেঙে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এভাব চললে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান বাড়বে এবং এক দশকের মধ্যে বিশ্ব প্রথম ট্রিলিওনিয়ারের দেখা যাবে। আর এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২২৯ বছরেও বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য নির্মূল হবে না।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কঠোর পরিশ্রম করেও নিশ্চিত ও অনিরাপদ চাকরি থেকে কম মজুরি পাচ্ছে দারিদ্র্যরা। ৫২টি দেশে প্রায় ৮০ কোটি শ্রমিকের গড় প্রকৃত মজুরি কমেছে। তারা গত দুই বছরে সম্মিলিতভাবে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, যা প্রতিটি শ্রমিকের ২৫ দিনের হারানো মজুরির সমান।

এক শ্রেণির জীবনযাত্রার সংকটের মধ্যেও অন্যদিকে ব্যবসায়িক মুনাফা দ্রুত বেড়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম করপোরেশনগুলোর ১৪৮টি একত্রে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মোট ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার লাভ করেছে, যা ২০১৮-২১ সালের গড় নেট লাভের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেশি।

বৈষম্য পরিমাপের গিনি সূচক থেকে দেখা যায়, বৈশ্বিক আয় বৈষম্য এখন দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে তুলনীয়। এটিই বিশ্বের সর্বোচ্চ বৈষম্যের দেশ।