এক বছরে বিশ্বের ৪০০ কোটি বা প্রায় অর্ধেক মানুষ স্বাভাবিকের তুলনায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চরম তাপপ্রবাহে পুড়েছে। এক বছর ধরে এ অসহ্য গরমের প্রধান কারণ মানবসৃষ্ট জলবায়ু সংকট। এমনটাই উঠে এসেছে ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন, ক্লাইমেট সেন্ট্রাল ও রেড ক্রসের যৌথ এক প্রতিবেদনে।

গবেষকরা ২০২৪ সালের ১ মে থেকে ২০২৫ সালের ১ মে পর্যন্ত এক বছরের আবহাওয়াগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, এ সময়ে বিশ্বজুড়ে ৬৭টি চরম তাপপ্রবাহের (এক্সট্রিম হিট ইভেন্ট) ঘটনা ঘটেছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৯০ শতাংশেরও বেশি। এসব ঘটনার ফলে অনেক মানুষ মারা গেছে, অসুস্থ হয়েছে হাজারো। এছাড়া কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ সাধারণত গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়, কিন্তু তাপপ্রবাহের বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয় না। অথচ তাপপ্রবাহই বাস্তবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী জলবায়ু দুর্যোগগুলোর একটি।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, ‘তাপপ্রবাহ নীরব ঘাতক। এতে হয়তো মানুষ রাস্তায় পড়ে মারা যায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অসুস্থ হয়ে বাসায় কিংবা হাসপাতালে তাদের মৃত্যু হয়। তাই এটি চোখে পড়ে কম।’

তার মতে, প্রতি ব্যারেল তেল পোড়ানো, প্রতি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ও উষ্ণতার সামান্য বৃদ্ধি আরো বেশি মানুষকে তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে ফেলবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল অতিরিক্ত তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্যারিবিয়ানের আরুবা দ্বীপে গত এক বছরে ১৮৭ দিন তীব্র তাপপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন না ঘটলে বছরে এ সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল ৪৫ দিন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, নিম্ন আয়, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরাই তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

মধ্য এশিয়ায় গত মার্চ, দক্ষিণ সুদানে ফেব্রুয়ারি এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গত জুলাইয়ে তাপমাত্রার যে রেকর্ড করা হয়েছে, তা জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব হতো না—গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে। গত জুলাইয়ে মরক্কোতে তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, ফলে কমপক্ষে ২১ জনের মৃত্যু হয়।

রেড ক্রস রেড ক্রিসেন্ট ক্লাইমেট সেন্টারের রূপ সিং বলেন, ‘মানুষ বুঝতে পারছে তাপমাত্রা বাড়ছে, কিন্তু এটি যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই হচ্ছে তা তারা বুঝতে চাইছে না। আমাদের এখনই উন্নত সতর্কতা ব্যবস্থা, তাপপ্রবাহসংক্রান্ত কার্যকর কর্মপরিকল্পনা এবং নগর এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ সংকট মোকাবেলা করতে হবে।’

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ না করলে তাপপ্রবাহ আরো তীব্র হয়ে উঠবে। ক্রমাগত জ্বালানি তেল পোড়ানো এবং শিল্পসহ বিভিন্ন খাত থেকে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের ফলে এ সংকট আরো তীব্র হয়ে উঠছে। এতে দিন দিন বাড়ছে গরমের প্রকোপ। এ অবস্থা এক পর্যায়ে হয়তো পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এ চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি মানুষের সহনশীলতার বাইরে চলে যাবে।