২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর আত্মঘাতী হামলাকারীর গুলি ও বিস্ফোরণে নিহত হন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। প্রায় নয় বছরের নির্বাসন থেকে স্বদেশে ফেরার মাত্র দুই মাসের মাথায় আততায়ী হামলার শিকার হন তিনি, তখন দেশটির সাধারণ নির্বাচনের মাত্র সপ্তাহখানেক বাকি ছিল। ওই নির্বাচনে তার দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির জয়ের জোর সম্ভাবনাও ছিল। জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সরকার এ ঘটনার জন্য জঙ্গি দলগুলোকে দায়ী করলেও জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্তে উঠে আসে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও হত্যা-পরবর্তী আলামত ধ্বংসের বিষয়টি। জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের পর্যবেক্ষণ এবং ঘটনাকালীন প্রত্যক্ষ বিবরণে স্পষ্ট হয় এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ধারাবাহিক ফল। যেখানে নিরাপত্তা, প্রশাসন, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা একযোগে ভেঙে পড়েছিল অথবা নিরাপত্তা নিশ্চিতে অনিচ্ছুক ছিল।

বেনজির ভুট্টো পাকিস্তানে ফিরে আসার ঝুঁকি সম্পর্কে জানতেন। নির্বাসন শেষে ২০০৭ সালের অক্টোবরে যেদিন তিনি দেশে ফেরেন, সেদিনই স্বাগত শোভাযাত্রায় বোমা হামলা হয়। তিনি অক্ষত থাকলেও ১৪৯ জন নিহত হন। হত্যার দুই দিন আগে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে একটি চিঠি লেখেন, যেখানে কয়েকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন। তিনি মনে করতেন, এসব ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। হত্যার দিন সকালে তিনি আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইকেও বলেন, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এমনকি তিনি সিএনএনের উলফ ব্লিটজারকে ই-মেইল করে জানিয়েছিলেন, যদি তাকে হত্যা করা হয়, তিনি ‘মোশাররফকে দায়ী’ করবেন।

বেনজির ভুট্টো হামলার শিকার হন ২৭ ডিসেম্বর বিকালে। তার আগের দিন রাত প্রায় ১টার দিকে বেনজির ভুট্টোকে জানানো হয়, জনসভায় কেউ তাকে হত্যার চেষ্টা করবে। সতর্কবার্তাটি এসেছিল পাকিস্তানের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (আইএসআই) মহাপরিচালকের কাছ থেকে। তখন আইএসআইয়ের মহাপরিচালক তথা দেশটির দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাদিম তাজ। হামলার তথ্য এতটাই নিশ্চিত ছিল যে ২৬ ডিসেম্বর দিবাগত গভীর রাতে নাদিম তাজ স্বয়ং ইসলামাবাদের বেনজিরের বাসায় গিয়ে তাকে সতর্ক করেন। জেনারেল তাজ জানান, রাওয়ালপিন্ডিতে যে নির্বাচনী জনসভায় বেনজির ভাষণ দেবেন, সেখানে আত্মঘাতী হামলাকারীরা জনসভার আগে, চলাকালীন অথবা পরে—যেকোনো সময়ে হামলা চালাতে পারে। বেনজির ভেবেছিলেন, জনসভা বাতিল করাতে কৌশলে ভয় দেখানো হচ্ছে। তিনি তাজকে বলেন, ‘যদি আপনি আত্মঘাতী হামলাকারীদের কথা জানেন, তাহলে তাদের গ্রেফতার করুন।’ তাজ জবাব দেন, ‘তা সম্ভব নয়—কারণ তাতে তার তথ্যসূত্র ফাঁস হয়ে যাবে।’ বেনজির জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আপনি নিরাপত্তা বাড়ান।’ কিন্তু এসব হুমকির পরও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সেই মাত্রায় জোরদার করা হয়নি।

vutto-inner

অন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের জন্য যেখানে ভিভিআইপি স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লিখিত ও নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল, সেখানে বেনজির ভুট্টোর ক্ষেত্রে তেমন স্পষ্ট নির্দেশ বা কঠোর নিরাপত্তা কাঠামো ছিল না। জাতিসংঘ কমিশনের ভাষায়, ‘এটার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

রাওয়ালপিন্ডি পুলিশ একটি নিরাপত্তা পরিকল্পনা করেছিল—এলিট ফোর্স দিয়ে গাড়িকে ঘিরে ‘বক্স ফরমেশন’, ছাদে স্নাইপার পর্যবেক্ষণ, পর্যাপ্ত চেকপোস্ট ইত্যাদি। কিন্তু ভিডিও ও সাক্ষ্যে দেখা যায়, এসবের কিছুই বাস্তবে কার্যকর করা হয়নি। বেনজির ভুট্টোর গাড়ির চারপাশে পুলিশি বেষ্টনীও কার্যত অনুপস্থিত ছিল। জাতিসংঘ কমিশন জানিয়েছিল, হত্যার দিন ভুট্টোর নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল তিন পক্ষের ওপর—ফেডারেল সরকার, পাঞ্জাব প্রাদেশিক সরকার এবং রাওয়ালপিন্ডি জেলা পুলিশ। কমিশনের ভাষায়, এ তিনটি পক্ষই নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে জানত, তবু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি। র‍্যালি শেষে বের হওয়ার পথে পুলিশ ভেতরের ও বাইরের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। ফলে ভিড় ভুট্টোর গাড়িকে ঘিরে ফেলেছিল। এতে গাড়ির গতি কমে যায়। ভিডিও-ছবিতে ওই সময় পুলিশ উপস্থিতিও খুব কম দেখা যায়। আর যে ‘এলিট ইউনিট’ গাড়ির চারপাশে ‘বক্স’ ফরমেশনে নিরাপত্তা দেয়ার কথা—তারাও উপস্থিত ছিল না। পুলিশের দায়িত্ব ছিল দ্রুত ও মসৃণভাবে গাড়ি বের করা, প্রয়োজনে বিকল্প রুট চালু করা। কিন্তু বিকল্প রুটই বন্ধ হয়ে ছিল—পার্ক করা পুলিশ গাড়ি দিয়ে। এমনকি হামলা হলে কী হবে সে বিষয়ে কোনো ‘প্ল্যান বি’ ছিল না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

জাতিসংঘ কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা আরো ভয়াবহ রূপ নেয়। মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ অপরাধস্থল ধুয়ে ফেলে। এতে রক্ত, বিস্ফোরকের আলামত, গুলির চিহ্ন—সব নষ্ট হয়ে যায়। একটি আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় যেখানে হাজার হাজার ফরেনসিক আলামত থাকার কথা, সেখানে উদ্ধার করা হয় মাত্র ২৩টি। জাতিসংঘ কমিশনের মতে, এটি তদন্তে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ করেছে এবং এর পেছনে ইচ্ছাকৃত গাফিলতির লক্ষণ রয়েছে। হত্যার পরদিনই পারভেজ মোশাররফ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বায়তুল্লাহ মেহসুদ ও আল-কায়েদাকে দায়ী ঘোষণা করে। এ ঘোষণা আসে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরুর আগেই। ফলে তদন্তের দিক একতরফাভাবে নির্ধারিত হয়ে যায়। সম্ভাব্য অন্য জড়িত পক্ষ বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরের কোনো উপাদান—শুরুতেই কার্যত বাদ পড়ে যায়। বেনজির নিজে যাদের নাম উল্লেখ করে হুমকির কথা জানিয়েছিলেন, সে দিকগুলো তদন্তে গুরুত্ব পায়নি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পূর্ণ সহযোগিতা করেনি। ফলে তদন্ত ছিল অসম্পূর্ণ, পক্ষপাতদুষ্ট এবং সত্য অনুসন্ধানে অনিচ্ছুক।

জাতিসংঘ তদন্ত কমিশনের দায়িত্বে ছিলেন চিলির সাবেক জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক ব্যুরোর তৎকালীন সহকারী মহাসচিব ও পরিচালক হারাল্ডো মুনিয়োজ। তদন্তের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দুই বছর সময় নিয়ে একটি বই লেখেন তিনি। মুনিয়োজের মতে, পাকিস্তানে এমন অনেক পক্ষ ছিল যারা তাকে সরিয়ে দিতে চাইতে পারে। হত্যাকাণ্ডের ২ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে স্থানীয় পুলিশ অপরাধস্থল ধুয়ে ফেলেছিল। ফলে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়।

২০০৭ সালের শেষ ভাগে পাকিস্তান ছিল এক গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভাঙাচোরা আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি রাষ্ট্র। জেনারেল পারভেজ মোশাররফের দীর্ঘ সামরিক শাসনের শেষ প্রান্তে। ১৯৯৯ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা মোশাররফ একদিকে নিজেকে ‘সংস্কারক’ ও ‘সন্ত্রাসবিরোধী মিত্র’ হিসেবে পশ্চিমা বিশ্বে তুলে ধরছিলেন। অন্যদিকে দেশে তার শাসন ক্রমেই বৈধতা হারাচ্ছিল। ২০০৭ সালে প্রধান বিচারপতি ইফতিখার চৌধুরীকে বরখাস্ত করার ঘটনায় দেশজুড়ে আইনজীবী আন্দোলন শুরু হয়, যা শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এতে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও নির্বাহী ক্ষমতার মধ্যে প্রকাশ্য সংঘাত তৈরি হয়। পারভেজ মোশাররফ নিজেও সামরিক শাসনকে আংশিক বেসামরিক রূপ দিতে মরিয়া ছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষমতা ছাড়তে অনিচ্ছুক ছিলেন। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব চাইছিল ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির চাপ ছিল নির্বাচন দিতে হবে এবং বেনজির ভুট্টোকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এর ফল হিসেবে ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন অর্ডিন্যান্স জারি হয়। যার মাধ্যমে বেনজির ও তার স্বামী আসিফ আলী জারদারির বিরুদ্ধে বহু মামলা প্রত্যাহার করা হয়। যদিও সামরিক-বেসামরিক এস্টাব্লিশমেন্টের একটি বড় অংশ বেনজিরের প্রত্যাবাসন মেনে নিতে পরেনি।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল আরো নাজুক। একদিকে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তালেবান ও জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান, অন্যদিকে বড় শহরগুলোতে আত্মঘাতী হামলা ছিল নিয়মিত চিত্র। শুধু ২০০৭ সালেই পাকিস্তানে শতাধিক আত্মঘাতী হামলা ঘটেছিল। করাচি, ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি—সব বড় শহরেই হামলার আশঙ্কা ছিল নিয়মিত বাস্তবতা।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো শক্তিশালী হলেও তাদের কাজের অগ্রাধিকার ছিল ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা’র নিজস্ব সংজ্ঞা, যা অনেক সময় নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের নিরাপত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠত। বেসামরিক কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি ছিল প্রকট। বেনজির ভুট্টো এ ভাঙা বাস্তবতার মধ্যেই দেশে ফেরেন। তিনি একদিকে ছিলেন জনপ্রিয় নেতা, অন্যদিকে ক্ষমতা কাঠামোর জন্য অস্বস্তিকর চরিত্র। তার বিরুদ্ধে হুমকি আসছিল জঙ্গিগোষ্ঠী থেকে। আবার একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ভেতরের কিছু শক্তিও তাকে পুরোপুরি ‘নিরাপদ’ দেখতে আগ্রহী ছিল না।

হারাল্ডো মুনিয়োজের মতে, ‘বেনজিরকে অনেকে ঘৃণা করত। আল-কায়েদা তাকে ঘৃণা করত, পাকিস্তানি তালেবানও ঘৃণা করত—প্রথমত তিনি একজন নারী বলে। তিনি পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত নারী। তারা তাকে ‘আধুনিকতাবাদী’ বলত। তারা তাকে শিয়া বলে অভিযুক্ত করত। তারা তাকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের কাছে ‘বিক্রি হয়ে যাওয়া’ বলে অভিযুক্ত করত। এসবই তাকে অনেকের কাছে ঘৃণিত করেছিল, তবে বিপুল মানুষের কাছে তিনি আবার খুবই প্রিয়ও ছিলেন।’

২০০৭ সালের পাকিস্তান ছিল এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে রাজনৈতিক সংকট, নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রতিষ্ঠানগত অবিশ্বাস তীব্র আকার ধারণ করেছিল। এমন পরিবেশে একজন জনপ্রিয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কার্যকরভাবে রক্ষা করতে যে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা, সমন্বিত সিদ্ধান্ত ও পেশাদার নিরাপত্তা প্রস্তুতি প্রয়োজন তার ঘাটতিই শেষ পর্যন্ত বেনজির ভুট্টোকে আততায়ীর গুলি ও বিস্ফোরণের সামনে প্রায় নিরাবরণ করে দেয়। পরিণতিতে যে মৃত্যু ঘটেছিল, তা কেবল একটি সন্ত্রাসী হামলা নয়—রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, অবহেলা ও দায় এড়ানোর ধারাবাহিকতারই নির্মম পরিণতি।