থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যকার শতবর্ষের পুরনো সীমান্ত বিরোধ নতুন করে সংঘাতে রূপ নিয়েছে। গতকাল দুই দেশের সীমান্তে সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে থাইল্যান্ডে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে আট বছর বয়সী এক শিশু এবং ১৫ বছরের এক কিশোরও রয়েছে। থাই সেনাবাহিনীর দাবি, নিহতদের মধ্যে ১১ জন বেসামরিক ও একজন সেনা সদস্য। কম্বোডিয়া এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতের সংখ্যা জানায়নি।
থাই সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের টহল ইউনিটের ওপর কম্বোডিয়ার বাহিনী প্রথমে রকেট হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে থাই বাহিনী গুলি চালায়। অন্যদিকে কম্বোডিয়ার দাবি, থাইল্যান্ড তাদের একটি মন্দিরের চারপাশে বেআইনিভাবে কাঁটাতার স্থাপন করে এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে কম্বোডিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালায়। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কম্বোডিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যালি সোচিতা বলেন, ‘প্রথমে থাই সেনারাই গুলি চালিয়েছে। আমরা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে বাধ্য হই।’ ঘটনার পর থাইল্যান্ড তাদের সীমান্ত বন্ধ ঘোষণা করে, সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে ৪০ হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেয়। উভয় দেশই পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করার ঘোষণা দেয়।
দুই দেশের মধ্যে বিরোধের শেকড় ঔপনিবেশিক ইতিহাসে। ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনামলে (১৯০৭ সালে) যে সীমান্ত চুক্তি হয়েছিল, তাতে বর্তমানে বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের মানচিত্র সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়নি। ফলে শতবর্ষ পর এসেও সীমান্ত রেখা নিয়ে দুই দেশের অবস্থান বিপরীতমুখী। সবচেয়ে বিতর্কিত এলাকা হচ্ছে প্রি-ভিহেয়ার মন্দির এলাকা, যেটি ২০০৮ সালে কম্বোডিয়া ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধনের উদ্যোগ নেয়। থাইল্যান্ড এ উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করে। সেই থেকেই বিরোধ ঘন ঘন সংঘর্ষে রূপ নিতে শুরু করে।
তবে সাম্প্রতিক সংঘর্ষকে কেবল সীমান্ত ইস্যু বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া উভয়ই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূকৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। চীন এরই মধ্যে কম্বোডিয়ায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বন্দর, সড়ক ও সামরিক ঘাঁটির উন্নয়ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো এ আগ্রাসী চীনা প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে থাইল্যান্ড ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ। যদিও তারা সম্প্রতি চীনের সঙ্গে সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়ন করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ সীমান্ত উত্তেজনা কেবল দ্বিপক্ষীয় দ্বন্দ্ব নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীন বনাম পশ্চিমা বলয়ের কৌশলগত দোলাচলের প্রতিফলন। চলমান সংঘাত পরিস্থিতি এ অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো ও অর্থনৈতিক সংহতিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার শুরু মে মাসে, যখন সংঘর্ষে এক কম্বোডিয়ান সেনা নিহত হয়। গত দুই মাসে দুই দেশ একে অন্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কম্বোডিয়া থাইল্যান্ড থেকে ফল, সবজি, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট আমদানি বন্ধ করে দেয়। এ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। একই সঙ্গে সীমান্ত অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি জোরদার করেছে উভয় পক্ষই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসিয়ানভুক্ত দুই দেশের মধ্যে এমন যুদ্ধাবস্থা আসিয়ান অঞ্চলের ঐক্য ও সমন্বয়ের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অতীতে এ ধরনের সংকট আসিয়ান প্লাটফর্মে আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা গেলেও এবার পরিস্থিতি অনেক জটিল এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে।










