তাইওয়ানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগেসিভ পার্টির (ডিপিপি) প্রার্থী উইলিয়াম লাই চিং তে। বর্তমানে তিনি দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট। চিকিৎসক থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হওয়া এ নেতা দলে ও দলের বাইরে স্পষ্টবাদী হিসেবে পরিচিত। তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষের কট্টর সমর্থক এ নেতাকে ‘ট্রাবলমেকার’ বা সমস্যা সৃষ্টিকারী মনে করে চীন। একই সঙ্গে তাকে ‘বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলেও আখ্যা দিয়েছিল বেইজিং। এমন একজন নেতা ক্ষমতায় আসার পর কোন পথে হাঁটতে পারে তাইওয়ান, সে প্রশ্নই এখন রাজনীতি বিশ্লেষক থেকে সাধারণ মানুষের। খবর সিএনএন ও বিবিসি।
দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে আসছে চীন। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ানকে একত্রীকরণের বিষয়কে একটি এজেন্ডায় পরিণত করেছেন। যদিও এজেন্ডা বাস্তবায়নে খুব বেশি সফল হতে পারেনি জিনপিং প্রশাসন। তবে ১৩ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রেখেছিল বেইজিং। তাইওয়ানের এবারের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনকে ‘যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যে একটিকে বেছে নেয়া’ বলে অভিহিত করেছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সরকার। বেইজিংয়ের সেই চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই ক্ষমতাসীনদের ভোট দিয়েছে তাইওয়ানিজরা।
উইলয়াম লাই জিতলেও এবারের ভোটে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৫৭ আসন জিততে পারেনি। তাইওয়ানের পার্লামেন্টে আসন সংখ্যা ১১৩। প্রধান বিরোধী দল কেএমটি সবচেয়ে বেশি ৫২টি আসন পেয়েছে। একটি আসন কম পেয়েছে লাইয়ের দল ডিপিপি। টিপিপি জিতেছে আটটি আর বাকি দুই আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উইলিয়াম লাই ৪০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। কিন্তু তার দল পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, এমনকি সবচেয়ে বেশি আসনও তাদের নয়। ফলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে লাইয়ের নতুন যাত্রা খুব বেশি সুখকর হবে না বলে মনে করেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা।
ডিপিপির জন্য এটি টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা। দলটিকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে মনে করা হয়। ৬৪ বছর বয়সী উইলিয়াম লাই এখন কীভাবে বেইজিংকে সামলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন সেটি বড় প্রশ্ন।
লাই অঙ্গীকার করেছেন, তার মেয়াদ হবে পূর্বসূরি সাই ইং-ওয়েনের আট বছরের শাসনের ধারাবাহিকতা। প্রথম ভাষণে তিনি বেশ সতর্ক হয়েই কথাবার্তা বলেছেন। একই সঙ্গে সংলাপ ও সহযোগিতার ডাক দিয়েছেন।
লাই ও তার রানিংমেট সিয়াও বি খিম দুজনকেই মূল চীনা ভূখণ্ড ও হংকং ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে চীন। ফলে চীন নতুন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সংলাপে যাবে, এটা খুবই অনিশ্চিত।
এদিকে অপছন্দের প্রার্থী ক্ষমতায় আসার পর চীন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ আরো বাড়াতে পারে। তাইওয়ানের বিভিন্ন কোম্পানি, পণ্য ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিতে পারে।
এক্ষেত্রে লাইয়ের কৌশল হতে পারে পূর্বসূরি সাইকে অনুসরণ করা। তিনি তাইওয়ানের সামরিক বাহিনীর জন্য ব্যয় বৃদ্ধি, সাবমেরিন তৈরির কর্মসূচি চালু রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন সাই। যদিও উইলিয়াম লাই বিজয়ী হওয়ার পর তাইওয়ানের স্বাধীনতায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নেই বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
তাইওয়ানে ২০১৬ সালে শেষবার সরকার পরিবর্তন হয়েছিল। তখনই ক্ষমতায় আসে ডিপিপি। ডিপিপি ক্ষমতায় আসার জেরে তাইপের সঙ্গে বেশির ভাগ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে বেইজিং।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের চীনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আমান্ডা সিয়াও বলেছেন, তাইওয়ানের এ নির্বাচন এমন সময়ে হলো যখন প্রণালিতে বেশি উত্তেজনা বিরাজ করছে। যখন প্রণালিতে স্থিতিশীলতা রক্ষা করা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে একটি সংঘাত বাধার আশু আশঙ্কা নেই। কিন্তু যদি সংঘাত বাধে, তাহলে তার প্রভাব হবে বৈশ্বিক।
লাইয়ের জয়ের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় চীনের তাইওয়ানবিষয়ক কার্যালয়ের মুখপাত্র চেন বিনহুয়া একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, এ ভোট চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের পুনরেকত্রীকরণের অনিবার্য প্রবণতাকে বাধাগ্রস্ত করবে না। এ ভোট মৌলিক মানচিত্রকে পরিবর্তন করবে না। তাইওয়ান চীনের তাইওয়ান।










