মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। তবে একটি বিষয় মানতেই হয়, পররাষ্ট্রনীতিকে অদ্ভুত ও অচেনা পথে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তার দৃঢ়তা সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি এমন এক যুদ্ধ শুরু করেছেন, যার ফলে প্রতিপক্ষই উল্টো স্থায়ী দরকষাকষির শক্তিশালী হাতিয়ার পেয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান এখন সমুদ্রপথে পরিবাহিত বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ যাতায়াতের পথ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অবস্থানে পৌঁছেছে। একে ট্রাম্পের ‘অদ্ভুত সাফল্য’গুলোর অন্যতম বলেই ধরা যায়—অবশ্যই ব্যঙ্গার্থে।

ট্রাম্পের ভুল এখানেই শেষ নয়। ডলার পেমেন্ট সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণকে ধরা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্র, একেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন তিনি। কারণ এ অস্ত্র ব্যবহারে তার বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিত হুমকি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

এ প্রেক্ষাপটে ‘স্টেশনারি ব্যান্ডিট’ (স্থায়ী আসন গেড়ে বসা দস্যু) ও ‘রোভিং ব্যান্ডিট’ (ঘুরে বেড়ানো দস্যু) তত্ত্বটি প্রাসঙ্গিক। এলোমেলোভাবে কর আরোপ ও সম্পদ দখলের প্রবণতার কারণে ট্রাম্পের নীতিকে স্পষ্টতই দ্বিতীয় শ্রেণিতে ফেলা যায়। অন্যদিকে, তার পদক্ষেপই ইরানকে ‘স্টেশনারি ব্যান্ডিট’ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এ ধরনের দস্যুর উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়—পাহাড়ি গিরিপথ নিয়ন্ত্রণ করে পথচারীদের কাছ থেকে নিয়মিত ও পূর্ব নির্ধারিত খাজনা আদায়। এতে তাদের ক্ষমতা স্থিতিশীল থাকে। বিপরীতে ‘রোভিং ব্যান্ডিট’ হঠাৎ এসে সর্বস্ব লুট করে নেয়, ফলে তাদের কর্তৃত্ব টেকসই হয় না।

ইরানেও জ্বালানি তেল থেকে প্রাপ্ত আয় দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্কিত শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে, বিশেষ করে যখন এর বড় অংশ সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ট্রাম্পের পদক্ষেপের ফলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) জন্য হরমুজ প্রণালি থেকে টোল আদায় নতুন আয়ের উৎস হতে পারে
250621-donald-trump-cs-1622e1

ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক দেশের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, বোমা হামলার পরিণতি আগে থেকে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ট্রাম্প উপলব্ধি করতে পারেননি, এতে তেহরান সরকার কার্যত ‘স্টেশনারি ব্যান্ডিট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। সরাসরি হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর জাহাজ থেকে টোল আদায়ের কথাও বলছে ইরান। এর জবাবে ট্রাম্প ‘অবরোধের ওপর অবরোধ’ আরোপ করেছেন। উপসাগরীয় জলপথে জাহাজ চলাচল সীমিত করেছেন এবং ভবিষ্যতে টোল আয়ের অংশ পাওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন।

এ অচলাবস্থার পরিণতি কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। একইভাবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, যুক্তরাষ্ট্র কতদিন অবরোধ বজায় রাখতে পারবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ট্রাম্প ইরানের হাতে শক্তিশালী দরকষাকষির একটি বড় হাতিয়ার তুলে দিয়েছেন।

দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা। ১৯৮০ সালে ‘কার্টার ডকট্রিন’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার।

জ্বালানি তেল বিক্রির নিয়ন্ত্রণ ‘স্টেশনারি ব্যান্ডিট’ ধাঁচের শাসকদের জন্য বহুল পরিচিত কৌশল। এতে উৎপাদন ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখে পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করা যায়, যা ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করে। গবেষক রিকার্ডো সোরেস ডি অলিভেইরা পশ্চিম আফ্রিকার কিছু জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশকে ‘সফল ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এসব দেশে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত না হলেও শাসকগোষ্ঠী স্থিতিশীল থেকেছে।

ইরানেও জ্বালানি তেল থেকে প্রাপ্ত আয় দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্কিত শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে, বিশেষ করে যখন এর বড় অংশ সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ট্রাম্পের পদক্ষেপের ফলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) জন্য হরমুজ প্রণালি থেকে টোল আদায় নতুন আয়ের উৎস হতে পারে। এ আয়ের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামার ওপর এটি নির্ভরশীল নয়। পাশাপাশি, দেশভেদে ভিন্ন টোল নির্ধারণের মাধ্যমে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি হবে।

এমনকি সহযোগিতামূলক কোনো সমাধান—যেমন সুয়েজ বা পানামা খালের মতো চুক্তিভিত্তিক টোল ব্যবস্থা হলেও তা ইরানের জন্য লাভজনক হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এ খাত থেকে বছরে ৫ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে, যা গত বছরের ৪০-৫০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি তেল আয়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘স্টেশনারি ব্যান্ডিট’ (স্থায়ী আসন গেড়ে বসা দস্যু) ও ‘রোভিং ব্যান্ডিট’ (ঘুরে বেড়ানো দস্যু) তত্ত্বটি প্রাসঙ্গিক। এলোমেলোভাবে কর আরোপ ও সম্পদ দখলের প্রবণতার কারণে ট্রাম্পের নীতিকে স্পষ্টতই দ্বিতীয় শ্রেণিতে ফেলা যায়। অন্যদিকে, তার পদক্ষেপই ইরানকে ‘স্টেশনারি ব্যান্ডিট’ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এ ধরনের দস্যুর উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়—পাহাড়ি গিরিপথ নিয়ন্ত্রণ করে পথচারীদের কাছ থেকে নিয়মিত ও পূর্ব নির্ধারিত খাজনা আদায়
Trump threatens more strikes on Iran’s Kharg Island, pushes allies on Strait of Hormuz

হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার ভুক্তভোগী এখন পুরো বিশ্ব। ছবি: রয়টার্স

এ ধরনের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা ইরানকে একটি ‘স্বাভাবিক’ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতেও সহায়তা করতে পারে, যা এতদিন নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন ছিল। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও দীর্ঘদিন ধরে একধরনের ‘স্টেশনারি ব্যান্ডিট’ হিসেবে কাজ করেছে—ডলার পেমেন্ট সিস্টেম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বেছে বেছে বাণিজ্য সীমিত করে ভূরাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে ওয়াশিংটন আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) পণ্য বিনিময়ের মতো বিকল্প ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি।

তবে যুক্তরাষ্ট্র যতদিন লক্ষ্যভিত্তিকভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করেছে, ততদিন ডলারের বিকল্প খোঁজার প্রবণতা সীমিত ছিল। কিন্তু ট্রাম্প যখন ‘রোভিং ব্যান্ডিট’-এর মতো আচরণ শুরু করেন, এমনকি ব্রিকস দেশগুলোর বিরুদ্ধেও শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেন তখন ডলার এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা গতিশীল হয়। বিকল্প আর্থিক নেটওয়ার্ক ও স্টেবলকয়েন ব্যবহারের উদ্যোগও তার নীতির ফলে গতি পায়।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ফলাফল এখনো অনিশ্চিত। তবে এটা পরিষ্কার, বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন ট্রাম্প। তার নীতির ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রতিপক্ষ ‘স্থায়ী দস্যু’ হিসেবে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, আর যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ‘ঘুরে বেড়ানো দস্যু’র মতো আচরণ করে নিজের প্রভাব দুর্বল করে ফেলছে।

এফটি-তে প্রকাশিত অ্যালান বিটির কলাম অবলম্বনে