গাজায় দ্বিতীয় দিনের মতো হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ)। বোমা হামলায় গতকাল গাজায় ২০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস বলছে, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা সত্ত্বেও আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি। অন্যদিকে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট বেনয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, আলোচনা চলবে শুধু যুদ্ধের মধ্যেই এবং এটি কেবল শুরু। ইসরায়েল তার তিনটি প্রধান লক্ষ্য অর্জন না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে—বন্দিদের মুক্ত করা, হামাসকে ধ্বংস করা। খবর রয়টার্স ও আল জাজিরা।

গাজায় গতকাল ইসরায়েলের হামলার মাত্রা মঙ্গলবারের মতো একই রকম ছিল না। তবে নতুন করে শুরু হওয়া হামলা চলছে অবিরাম। স্বাস্থ্যকর্মীদের বরাত দিয়ে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে বুধবার বিভিন্ন হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে গাজার দক্ষিণ-উত্তরাঞ্চল থেকে মধ্য গাজার দিকে ছুটে যাচ্ছে বাসিন্দারা। আবার মধ্য গাজায় বোমা হামলার তীব্রতায় সেখান থেকে বাসিন্দারা সরে যাচ্ছে উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে। এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আরো অনেকের মরদেহ চাপা পড়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক মানবাধিকার সংস্থা। বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের মতে, ইসরায়েলি হামলার পর হতাহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে ছিন্নভিন্ন মাংস পেয়েছে তারা। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোয় হতাহতদের ভিড় সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের। তারা বলছেন, এত বিপুলসংখ্যক মানুষের স্থান সংকুলান সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আহতদের অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগও নেই। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই হাসপাতালগুলোয়।

ফিলিস্তিনের ওয়াফা বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, বুধবার ভোররাতে খান ইউনিসের উত্তরে ইসরায়েলের হামলায় এক নারী ও শিশু নিহত হয়েছে। ওদিকে গাজা সিটিতে হামলায় নিহত হয়েছে চারজন। তবে সর্বশেষ হামলায় নিহতের সংখ্যা এখনো জানায়নি গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এর আগে মঙ্গলবার ভোর থেকে গাজায় হামলা চালিয়ে ৪৩৬ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে আইডিএফ। নিহতদের মধ্যে ১৮৩ শিশু ও ৯৪ জন নারী। হামলায় গুরুত্বপূর্ণ হামাস নেতারা নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে আছেন গাজার উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল মাহমুদ আবু ওয়াতফা। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন। এরপর মঙ্গলবার রাতে নেতানিয়াহু ঘোষণা দেন, ‘এটি কেবল শুরু’। তিনি পূর্ণশক্তি দিয়ে গাজায় হামলা শুরু করাকে ইসরায়েলের প্রাথমিক লক্ষ্যে ফিরে যাওয়া বলেই বর্ণনা করেছেন। যুদ্ধবিরতির মধ্যে নতুন করে এ ধরনের হামলার ইঙ্গিত দিচ্ছে—স্থায়ীভাবে যুদ্ধ সমাপ্তির পরিকল্পনা আলোচনার বাইরে থাকতে পারে।

যদিও হামাস কর্মকর্তা তাহের আল-নোউনো বলেছেন, ‘গাজায় ইসরায়েলি আকাশ হামলা সত্ত্বেও হামাস আলোচনা বন্ধ করেনি।’

তবে তিনি এও বলেছেন যে নতুন কোনো চুক্তির প্রয়োজন নেই যখন একটি স্বাক্ষরিত চুক্তি এরই মধ্যে রয়েছে।

নতুন করে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে নিজ দেশেই কঠোর সমালোচনার শিকার হয়েছেন নেতানিয়াহু। তার বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির বিরোধী নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ। এক এক্স হ্যান্ডেলে লাপিদ লিখেছেন, সমগ্র জাতিকে একত্রিত হয়ে বলতে হবে ‘যথেষ্ট হয়েছে।’

তিনি আরো লেখেন, ‘আমি ইসরায়েলিদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি আপনারা রাস্তায় নামুন।’

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তেল আবিবের হাবিমা স্কয়ারে জড়ো হন প্রায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। এ সময় তারা নেতানিয়াহুকে ‘মিস্টার অ্যাবান্ডনমেন্ট’ (অবাঞ্ছিত) ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশের নিন্দা: গাজা উপত্যকায় পুনরায় ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসন শুরু করায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। গতকাল এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ হামলার ফলে শিশু ও নারীসহ নিরীহ বেসামরিক মানুষের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে এবং এ অঞ্চলে এরই মধ্যে ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। এতে বলা হয়েছে, নতুন করে এ সহিংসতা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রতি গুরুতর অবজ্ঞার প্রতিফলন। বাংলাদেশ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকায় ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর অব্যাহত নির্বিচার বিমান হামলার নিন্দা জানিয়েছে, যা মানবিক দুর্ভোগকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে এবং অসহায় ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে।