সুদানের অব্যাহত গৃহযুদ্ধের মধ্যে ২৮ অক্টোবর এল ফাশের শহরের সৌদি মাতৃসদন হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছিলেন ৩০ জন নারী। সেসময় কেউ কেউ সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছেন, কেউ আবার প্রসববেদনায় কাতর—ঠিক সে সময়ই শুরু হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। হাসপাতালটি ঘিরে হামলা চালায় দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর সশস্ত্র সদস্যরা।

এ হামলায় ৪৬০ জনের বেশি রোগী ও তাদের স্বজন নিহত হন। হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া সৌভাগ্যবানদের একজন হাসপাতালটির টেকনিশিয়ান আবদো-রাবো আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমি নারী ও শিশুদের চিৎকার শুনতে পেয়েছি। তারা হাসপাতালের ভেতরে সবাইকে হত্যা করছিল। যারা দৌড়ে পালাতে পেরেছিল শুধু তারাই প্রাণে বেঁচেছে’।

ইউক্রেন, গাজা, মিয়ানমার, কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (ডিআরসি) ও সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে আটকে পড়া লাখ লাখ বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা যে ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়েছে, এটি তার সাম্প্রতিক ও সবচেয়ে নৃশংস উদাহরণগুলোর একটি।

অথচ বিশ্বের প্রায় সব দেশই জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। এ কনভেনশনে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর কাছ থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে। তবু গত এক বছরে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর হামলার সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।

জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বে অন্তত ৬৭ কোটি ৬০ লাখ নারী সংঘাতপূর্ণ এলাকার আশপাশে বাস করেন। দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও এনজিও ইনসিকিউরিটি ইনসাইটের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে মাতৃসেবা কেন্দ্র, চিকিৎসাকর্মী ও গর্ভবতী নারীদের ওপর প্রায় ৩০০টি হামলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১১৯টি ঘটনায় হাসপাতাল ও প্রসবকক্ষ সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে। হামলাগুলোর বেশিরভাগই ঘটেছে ইউক্রেন, গাজা ও সুদানে।

তথ্য বলছে, এ সময়ে অন্তত ৬৮ জন ধাত্রী, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ নিহত হয়েছেন, ১৫ জন অপহৃত ও ১০১ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। ভিন্ন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গর্ভধারণ বা সন্তান প্রসবের সময় যেসব নারী মারা গেছেন, তাদের অর্ধেকই ছিলেন সংঘাতপূর্ণ এলাকায়। নারী ও দক্ষ চিকিৎসাকর্মীদের হত্যার পাশাপাশি এসব হামলা মাতৃ ও নবজাতক চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস করছে। ২০২২ সালের শুরু থেকে ইউক্রেনে অন্তত ৮০টি মাতৃত্ব ও নবজাতক সেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

মিয়ানমারেও গত দুই বছরে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে চিকিৎসাকেন্দ্রে বোমা হামলা হয়েছে। বহু ধাত্রী ও রোগী গ্রেফতার হয়েছে, হত্যা বা আহত করা হয়েছে অনেককে। তাদের জন্য কার্যত কোনো কার্যকর সুরক্ষা নেই, আর মাতৃত্বসেবায় হামলার ঘটনায় যুদ্ধাপরাধের বিচারও খুব কমই হয়। এ দায়মুক্তির পরিবেশ একটি ‘দণ্ডহীনতার সংস্কৃতি’ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন এনজিও ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের মানবাধিকার আইনজীবী পায়াল শাহ। তিনি বলেন, ‘জোরপূর্বক গর্ভধারণ বা বন্ধ্যাকরণের মতো প্রজননস্বাস্থ্যসেবার ওপর হামলাও একটি গোষ্ঠীর জন্ম প্রতিরোধ বা অস্তিত্ব ধ্বংস করার মাধ্যমে গণহত্যার কাজ হিসেবেও বিবেচিত হওয়া উচিৎ।

লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের আইনজীবী ও গবেষক মার্টেন ভ্যান ডার হেইডেন বলেন, ‘আতংক ছড়াতে ও সমাজের কাঠামো ভেঙে দিতে যদি হাসপাতালকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সহিংসতার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় তবে তা ভয়াবহ একটি প্রবণতা। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, অধিকাংশ মাতৃমৃত্যু নিয়মিত ও সাধারণ চিকিৎসার মাধ্যমেই প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু যুদ্ধ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলে, ফলে নিরাপদ সন্তান প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ আর থাকে না।