অন্যদিকে ইরানও নিজেদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো কংক্রিট ও মাটির স্তর দিয়ে আরো গভীরে সুরক্ষিত করা হচ্ছে। অর্থাৎ সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি শুধু ওয়াশিংটনেই নয়, তেহরানেও চলছে। খবর সিএনএন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে সিএনএন বলছে, হোয়াইট হাউজকে এরই মধ্যে জানানো হয়েছে যে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে বিমান ও নৌশক্তির উল্লেখযোগ্য সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে খুব দ্রুত হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে মার্কিন বাহিনী। তবে ট্রাম্প এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন বলে জানা গেছে। একদিকে তিনি সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি শুনছেন, অন্যদিকে সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করছেন এবং উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মতামত নিচ্ছেন।

বুধবার হোয়াইট হাউজের সিচুয়েশন রুমে জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠকে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একই দিনে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার জেনেভায় ইরানের সঙ্গে হওয়া পরোক্ষ আলোচনার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে প্রেসিডেন্টকে ব্রিফ করেন। তবে এসব বৈঠকের পরও সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়নি। একটি সূত্রের ভাষায়, বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প ‘অনেক সময় ধরে গভীরভাবে ভাবছেন’।

জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা ধরে পরোক্ষ আলোচনায় নোট আদান-প্রদান হলেও কোনো দৃশ্যমান সমাধান আসেনি। ইরানের প্রধান আলোচক দাবি করেছেন, উভয় পক্ষ কিছু মৌলিক নীতিতে একমত হয়েছে। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা বাকি রয়েছে। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরান তাদের অবস্থান আরো স্পষ্ট করবে বলে আশা করা হচ্ছে, যদিও এ সময়ের মধ্যে সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত থাকবে কিনা সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি।

হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, কূটনীতি সবসময় ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ হলেও সামরিক বিকল্প খোলা রয়েছে। তার মতে, ইরানের বিরুদ্ধে হামলার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি রয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এ অস্পষ্ট অবস্থানই দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

মাঠপর্যায়ে সামরিক প্রস্তুতির গতি পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আধুনিক বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডের নেতৃত্বাধীন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ সপ্তাহান্তে ওই অঞ্চলে পৌঁছতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যভিত্তিক মার্কিন বিমান বাহিনীর ট্যাংকার ও যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ধরনের সমাবেশ সাধারণত বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হয়।

হামলার সময় নির্ধারণে আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের কয়েকটি ঘটনাও বিবেচনায় থাকতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। শীতকালীন অলিম্পিকের সমাপ্তি, রমজানের সূচনা এবং ট্রাম্পের স্টেট অব দি ইউনিয়ন ভাষণ—তিনটি বিষয় রাজনৈতিক ও প্রতীকী দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্রদের কেউ কেউ রমজান মাসে হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কারণ এটি আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে এবং মুসলিম বিশ্বে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ও কৌশল নিয়েও এখনো স্পষ্টতা নেই। ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার কথা বললেও হামলার মাধ্যমে ঠিক কী অর্জন করতে চান তা প্রকাশ করেননি। এমনকি বড় ধরনের সামরিক অভিযানের জন্য কংগ্রেসের সমর্থন তৈরির ক্ষেত্রেও তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে সিদ্ধান্ত নিলে তার রাজনৈতিক প্রভাবও বড় হতে পারে।

এমন উত্তেজনার মধ্যে রাশিয়াকে নিয়ে যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করছে তেহরান ও মস্কো। গতকাল মধ্যপ্রাচ্যের ওমান সাগরে এ মহড়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। এর আগে হরমুজ প্রণালিতে গত সোমবার মহড়া চালায় ইরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড কোর। ওই মহড়া ছিল এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ। এরপর গতকাল ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল হাসান মাকসৌদলু ওমান সাগর ও ভারত মহাসাগরের উত্তরাঞ্চলে যৌথ মহড়ার ঘোষণা দেন।