ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রার বাতাং তোরু বনাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর খনি, বিদ্যুৎ ও বনজ শিল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে দেশটির সরকার। এ প্রাকৃতিক দুর্যোগে একদিকে যেমন প্রাণ হারিয়েছে এক হাজারের বেশি মানুষ, অন্যদিকে চরম হুমকির মুখে পড়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বিরল প্রজাতির টাপানুলি ওরাংওটানয়ের একমাত্র আবাসস্থল। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
২০২৪ সালের নভেম্বরে টানা ভারি বৃষ্টিতে বাতাং তোরু বনাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস এবং পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা কাদা, গাছের গুঁড়ি ও ধ্বংসাবশেষ আশপাশের গ্রামগুলো প্লাবিত করে। সরকারি ও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্যোগে প্রাণ হারায় ১ হাজার ১০০-এর বেশি মানুষ।
এ বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে টাপানুলি ওরাংওটানয়ের ওপরও। বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্যোগে টাপানুলি ওরাংওটান প্রজাতির মোট সংখ্যার প্রায় ৬ দশমিক ২ থেকে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে এ প্রজাতির সংখ্যা আনুমানিক ৮০০-এর মতো ধারণা করা হচ্ছে, যা শুধু এ বনাঞ্চলেই পাওয়া যায়।
ঘটনার পর পরই ওই এলাকায় সক্রিয় খনন, জলবিদ্যুৎ ও বনজ কোম্পানিগুলোর ভূমিকা নিয়ে তদন্ত শুরু করে ইন্দোনেশিয়া সরকার। কয়েক সপ্তাহের তদন্ত শেষে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো পরিবেশ ধ্বংসের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন। এর অংশ হিসেবে ওই অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ২৮টি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করা হয়।
এ তালিকায় রয়েছে মারতাবে স্বর্ণখনির পরিচালনাকারী পিটি অ্যাগিনকোর্ট রিসোর্সেস এবং বাতাং তোরু নদীতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী পিটি নর্থ সুমাত্রা হাইড্রো এনার্জি। এছাড়া কাঠ আহরণ ও পাম বাগানের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কোম্পানির অনুমতিও বাতিল করা হয়েছে। দেশটির ফরেস্ট এরিয়া রেগুলেশন টাস্কফোর্সের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার পরিবেশ মন্ত্রণালয় ছয়টি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জলাধার এলাকায় পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৪ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন রুপিয়া দাবি করেছে সরকার।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সরকারের এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, সব ভূমিধসের জন্য সরাসরি শিল্পকারখানাকে দায়ী করা ঠিক নয়। তাদের মতে, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢালের ভৌগোলিক দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে তারা একমত, খনন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো টাপানুলি ওরাংওটানয়ের আবাসস্থলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বাতাং তোরু এলাকায় সব ধরনের বন উজাড় স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে স্থানীয় মানুষ ও বিরল এ প্রাণী উভয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকে।










