নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৩৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি। তাদের মধ্যে কয়েকশ বিদেশী নাগরিক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। বুধবার কয়েক তলা ভবনের সমান উঁচু পানি ও কাদার স্রোত সীমান্তবর্তী একাধিক জনপদ ভাসিয়ে নেয়ার পর আজও নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালিয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা।
দুর্যোগের বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রবল স্রোত থেকে বাঁচতে মানুষ ছোটাছুটি করছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্যার পানি তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। স্রোতে অসংখ্য ভবন ও সেতু ধ্বংস হয়েছে। নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোট জেলার অনেক ভবনের দ্বিতীয়তলা পর্যন্ত কাদায় ঢেকে গেছে। গাছের ডাল ও বৈদ্যুতিক তারে ধ্বংসাবশেষ আটকে থাকতে দেখা গেছে। কাদার নিচে চাপা পড়েছে বহু যানবাহন।
কর্তৃপক্ষের পৃথক হিসাব অনুযায়ী, নেপালে অন্তত ২৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৮২৬ জন। অন্যদিকে চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতে তিনজনের মৃত্যু ও ৫৫৮ জন নিখোঁজ হওয়ার তথ্য দেয়া হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে নেপাল পুলিশের দেয়া সর্বশেষ হিসাবে জাননো হয়, মোট মৃতের সংখ্যা ৩৫৩-তে পৌঁছেছে।
নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যায় কয়েক ডজন সেতু ধ্বংস এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে স্থলপথে উদ্ধার অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালের সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারের সাহায্যে দুর্গত এলাকা থেকে শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করেছে। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় আটকে পড়া ব্যক্তিদেরও সরিয়ে নেয়া হয়েছে। গুরুতর আহত কয়েক ডজন মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডু নেয়া হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে কয়েকশ কিলোমিটার ভাটিতে চিতওয়ান জেলায়ও মরদেহ পাওয়া গেছে।
নেপাল রেড ক্রস সোসাইটির চেয়ারম্যান বিশাল কুমার ভান্ডারি জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি এখন বড় পরিসরে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অন্তত তিনটি গ্রামের প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
তিব্বতের গিরং সীমান্তবন্দরের কাছে ভূমিধসের পর আশপাশের এলাকায় গড়ে দেড় মিটারের বেশি কাদা জমেছে। সেখানে যাওয়ার সব সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে। চীন উদ্ধারকারী দল পাঠাতে একটি বড় সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং উদ্ধার কার্যক্রম তদারক করতে গিরংয়ে পৌঁছেছেন। দুটি নদীর মোহনায় সৃষ্টি হওয়া একটি প্রাকৃতিক বাঁধের হ্রদ উপচে পড়ছে এবং সেটি ভেঙে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছে চীন।
নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশী বলে জানিয়েছে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড। তাদের মধ্যে ভারতের ১৭৮ ও যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ জনের বেশি নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাপানসহ ৩০টির বেশি দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের অনেকেই তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাচ্ছিলেন। চীন জানিয়েছে, নেপালে তাদের প্রায় ১০০ নাগরিক নিখোঁজ। তিব্বতে নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমবাহ থেকে নেমে আসা তুষার ও পাথরের বিশাল ধস এ বন্যার কারণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা প্রথমে ঘটনাটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত করলেও পরে জানায়, এটি ছিল ৫ দশমিক ২ মাত্রার সমতুল্য হিমবাহ ধস। এতে ত্রিশূলী নদীর পানি আধা ঘণ্টায় প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহগুলো ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় পুরো অঞ্চলের জনপদ, অবকাঠামো ও পানি সরবরাহ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।









