বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক আলোচনাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে সিরিয়া। এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে বিপর্যস্ত দেশটির নতুন সরকার এখন রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী ও অর্থনীতি পুনর্গঠনে মনোযোগী। এ অবস্থায় নতুন কোনো যুদ্ধে জড়ানো দামেস্কের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে বলে মনে করছে তারা। তবে সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা ও সামরিক তৎপরতা দেশটির এ কৌশলকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনাকে এখনো বিশ্বাসের সম্পর্ক হিসেবে দেখছে না দামেস্ক। বরং সিরিয়ার কাছে এটি নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি সম্প্রতি রয়টার্সকে বলেছেন, ‘বর্তমানে আমরা ইসরায়েলকে বিশ্বাস করি না।’

বাশার আল-আসাদের আমলে সিরিয়া ছিল ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ। সিরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র ও অর্থ পাঠাত ইরান। তবে ১৯৭৪ সালের বিচ্ছিন্নকরণ চুক্তির পর সিরিয়ার সেনাবাহিনী সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়নি।

আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীরা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দামেস্ক দখল করে আসাদ সরকারের পতন ঘটানোর পরপরই সিরিয়ার বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায় ইসরায়েল। অধিকৃত গোলান মালভূমির সীমানা অতিক্রম করে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের আরো কিছু এলাকাতেও প্রবেশ করে ইসরায়েলি সেনারা। সেখানে তারা তল্লাশিচৌকি স্থাপন এবং সিরীয় নাগরিকদের আটক করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিরিয়ার নতুন সরকার বারবার বলেছে, ইসরায়েলে হামলা চালানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। প্রতিবেশী সব দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক চায় দামেস্ক। তা সত্ত্বেও দক্ষিণ সিরিয়ায় সেনা মোতায়েনের বিরুদ্ধে দেশটিকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইসরায়েল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দামেস্কে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়েও হামলা চালানো হয়।

কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়নের শিক্ষক রব গাইস্ট পিনফোল্ড বলেন, সিরিয়ার সরকার অত্যন্ত বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হলে তারা যেকোনো পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতা করতে প্রস্তুত। সিরীয়রা দীর্ঘ যুদ্ধ ও সংঘাতে ক্লান্ত; তারা এখন স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন চায়।

লেবাননভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাদিলের বিশ্লেষক সৌহাইব জাওহারের মতে, দামেস্কের তাৎক্ষণিক দাবি তিনটি—সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ, সীমান্ত অতিক্রম ও সিরীয় নাগরিকদের আটক বন্ধ এবং আসাদ সরকারের পতনের পর দখল করা এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার।

সম্প্রতি জর্ডানের রাজধানী আম্মানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গফম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আল-শাইবানি। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলা ও আটক অভিযান বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চুক্তির আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করা ছিল বৈঠকের প্রধান উদ্দেশ্য।

তবে আলোচনার মধ্যেই উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ইদলিবের কাছে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। বিশ্লেষকদের ধারণা, সিরিয়ার বিমানবাহিনী পুনর্গঠনের উদ্যোগ এবং উত্তর সিরিয়ায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা হিসেবেই এ হামলা চালানো হয়েছে।

সংঘাত এড়ানোর সরকারি নীতির প্রতি সিরীয়দের সমর্থন থাকলেও এর অর্থ গোলান মালভূমির দাবি ছেড়ে দেয়া নয়। ১৯৬৭ সাল থেকে অঞ্চলটি দখলে রেখেছে ইসরায়েল। দেশটি গোলান ছাড়ার কোনো ইঙ্গিতও দেয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের বর্তমান সরকার রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে সামরিক স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কার্যকর চাপ ছাড়া স্থায়ী নিরাপত্তা চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। দামেস্ক কূটনীতিকে সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল পথ হিসেবে বেছে নিলেও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া না এলে এ কৌশল দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।