ইরানের নিয়ন্ত্রণের কারণে হরমুজ প্রণালিতে ছয় সপ্তাহ ধরে আটকে আছেন প্রায় ২০ হাজার নাবিক। তাদের একজন নিজের অবস্থার বর্ণনায় বললেন এভাবে, যুদ্ধ পরিস্থিতি মানসিকভাবে খুব চাপ তৈরি করেছে। চেষ্টা করলেও এখন নিজেকে সামলানো প্রায় অসম্ভব।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা কিছুটা আশাবাদ জুগিয়েছিল সম্প্রতি। মুক্তির যে ক্ষীণ আশা ছিল যুদ্ধরত দুই পক্ষের পরষ্পরবিরোধী মন্তব্যে তাও এখন প্রায় নিঃশেষ।

এক মাস আগে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের ওই কর্মী বলেছিলেন, ‘আমরা নোঙর করে আছি, চারপাশে ডজনখানেক জ্বালানি তেলভর্তি ট্যাংকার। কেউ এক ইঞ্চিও নড়েনি।’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) উপকূলের কাছে শত শত জাহাজের মতো তার ট্যাংকারটিও স্থির। সেখান থেকে কয়েক সপ্তাহ আগে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জ্বলতে থাকা কুয়েতি একটি তেলবাহী জাহাজ দেখছিলেন তারা। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আকাশে প্রতিহত হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ার রেখা দেখা গেছে। দেড় মাস ধরে ড্রোন হামলা ও পানির নিচে মাইন থাকার আশঙ্কায় যুদ্ধবিরতি থাকলেও অনেক নাবিকই এখন প্রণালি পাড়ি দিতে অনিচ্ছুক।

ওই নাবিক বলেন, ‘আমি এক মাস আগে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। ক্যাপ্টেনকে জানিয়েছি, আমি এই প্রণালি দিয়ে যেতে রাজি নই। এটা পুরোপুরি নিরাপত্তার বিষয়।’

তার দাবি, একই জাহাজের প্রায় ৯০ শতাংশ নাবিকই ওই পথ পাড়ি দিতে অস্বীকার করেছেন। একজন সহকর্মী এরই মধ্যে ‘মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন’ এবং অন্যরা তাকে নিয়মিত দেখভাল করছেন।

তিনি বলেন, ‘এই মানসিক ভাঙনের ঘটনা শুধু আমাদের জাহাজে নয়, আশপাশের অনেক জাহাজেই ঘটছে বলে আমার বিশ্বাস। সহায়তার জন্য হটলাইন আছে, কিন্তু শুরু থেকেই আমরা জানতাম, তা যথেষ্ট হবে না।’

সংঘাত শুরুর পর থেকে ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (আইটিএফ) ৩০০টি জাহাজের প্রায় এক হাজার নাবিকের কাছ থেকে সহায়তার অনুরোধ পেয়েছে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ নিজ দেশে ফেরার আবেদন করেছেন। বেতন, জ্বালানি, খাবার ও পানির মতো জরুরি সরবরাহ নিয়ে অন্যদের অভিযোগ রয়েছে।

Trump demands other countries help secure vital Strait of Hormuz as Iran vows defiance

হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি কাছাকাছি অবস্থান নেয়া কুয়েতের একটি জ্বালানি তেলবাহী জাহাজে হামলার পর প্রথমবারের মতো হেল্পলাইনে ফোন করেন ওই নাবিক। তিনি বলেন, ‘আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, নিজেকে সামলাতে পারব না। অপরিচিত কারো কাছে মন খুলে বলাটা কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।’

দূর থেকে পরামর্শ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন বলে জানান আন্তর্জাতিক নাবিকদের শ্রমিক ইউনিয়ন নটিলাস ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডেভিড অ্যাপলটন। তার ভাষায়, ‘সবাই চেষ্টা করছে, কিন্তু আসল সমাধান হলো মানুষকে এ পরিস্থিতি থেকে সরিয়ে আনা।’

তিনি আরো বলেন, সহিংসতার হুমকি যেমন মানসিক চাপ তৈরি করছে, তেমনি অনিশ্চয়তা—কতদিন এমন চলবে, তা না জানাও বড় চাপ।

এ পরিস্থিতিতে জাহাজমালিকদের প্রতি আহ্বান উঠেছে নতুন ক্রু এনে বদলি করার। নিয়ম অনুযায়ী বিপজ্জনক এলাকায় কাউকে কাজ করতে বাধ্য করা যায় না, তবে অর্থের প্রয়োজনে অনেকেই রাজি হচ্ছেন।

ওই নাবিক বলেন, ‘যারা আসবে, তাদের অন্তত একটি পছন্দ থাকবে। আমাদের সেই সুযোগও নেই।’

শিগগিরই তাদের জাহাজে নতুন ক্রু আসবে এমন আশা নিয়ে ওই নাবিক বলেন, ‘আমি মানসিকভাবে আর কাজ করার অবস্থায় নেই। জীবনে এত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি।’

‘সারাজীবন এ পেশায় আছি। ছেড়ে দিলে যা কিছু অর্জন করেছি তার সব হারাব, আর থাকলে হয়তো আবার এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। সিদ্ধান্তটা নিতে পারব শুধু বাড়ি ফিরে। তখন ভাবার মতো কিছুটা সময় মিলবে।’