বৈশ্বিক পুঁজিবাজার কয়েক মাস ধরে ওয়াল স্ট্রিটের উত্থান-পতনের ওপর নির্ভর করছে। ব্যতিক্রম নয় ইউরোপীয় বাজার সূচকগুলোও। যদিও এখন খোদ ওয়াল স্ট্রিটেরই পরিস্থিতি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ‘এআই বাবল’ ফেটে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ধস নামলে এশিয়া ও ইউরোপের বাজার থেকে রাতারাতি গায়েব হয়ে যেতে পারে বিপুল পরিমাণ পুঁজি। গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেই দেখা যেতে পারে ওয়াল স্ট্রিটে ধসের মারাত্মক ডোমিনো ইফেক্ট। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া থেকে বেরিয়ে ইউরোপের অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের প্রত্যাশা করছেন মহাদেশটির অনেক বিনিয়োগকারী ও বাজারসংশ্লিষ্টরা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগানের অনুকরণে মহাদেশটিতে এখন অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের দাবি তুলে বলা হচ্ছে ‘মেক ইউরোপ গ্রেট অ্যাগেইন’। খবর রয়টার্স।
বিশেষ করে আঞ্চলিক শীর্ষ অর্থনীতি জার্মানিতে সরকারি ব্যয় বাড়ার পদক্ষেপকে ঘিরে এখন প্রত্যাশা বাড়ছে। আবার রাশিয়া-ইউক্রেনের প্রত্যাশিত শান্তি চুক্তিও বিনিয়োগকারীদের মনোবল বাড়াতে পারে। এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপীয় শেয়ারবাজারগুলো বেশির ভাগ বিনিয়োগকৃত পুঁজির বিপরীতে প্রত্যাশিত রিটার্ন তুলে নিতে পারেনি। তবে এত আশাবাদ সত্ত্বেও বাজারের বাস্তবতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে চান বিনিয়োগকারীরা।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) ইউরোপীয় শেয়ারবাজার সূচকগুলো মার্কিন সূচকগুলোর তুলনায় ভালো পারফর্ম করেছে। কারণ ওই সময় অঞ্চলটি যৌথভাবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছিল। ঋণনীতি পুনর্গঠন করেছিল জার্মানি। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরিয়েছিল। ইউরোপের অর্থনীতিতে সে সময়ই পুনর্জাগরণের আশা তৈরি হয়।
যদিও পরে শুল্ক নিয়ে আশঙ্কা কমার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সূচকগুলো তুলনামূলক ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে শুরু করে। বিপরীতে অঞ্চলটির শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়ার গতিও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশ শ্লথ হয়ে আসে। বিনিয়োগ তথ্য পরিষেবাদাতা কোম্পানি ইপিএফআরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে ৮ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সর্বশেষ ছয় মাসে হয়েছে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী বছর ইউরোপীয় শেয়ার সূচকগুলো ভালো করার সম্ভাবনা আছে। তবে সেটিও মার্কিন পুঁজিবাজারের ওপর নির্ভর করতে পারে। ছয়টি প্রধান মার্কিন ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের মধ্যে চারটির আশঙ্কা, ইউরোপ আগামী বছরও পিছিয়ে থাকবে। এর কারণ হলো মার্কিন পুঁজিবাজারে আগামী বছরও এআই খাতের বিনিয়োগ ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। আবার ইউরোর মূল্যায়নও অনেকটাই ডলারের বিনিময় হারের ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারে। রয়টার্স পরিচালিত এক জরিপে এ ছয় ব্যাংকের মধ্যে দুটি ইউরোর অবমূল্যায়নের পূর্বাভাস দিয়েছে।
ডলারের বিপরীতে ইউরোর বিনিময় হার এখন চার বছরের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা নিচে অবস্থান করছে। বর্তমানে প্রতি ইউরোর বিনিময় হার ১ ডলার ২০ সেন্টের কিছু কম।
পিকটেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সিনিয়র মাল্টি-অ্যাসেট স্ট্র্যাটেজিস্ট অরুণ সাইয়ের মতে, ‘ইউরোপের বিনিয়োগকারীরা এখন স্থানীয় পরিস্থিতির (এতদিন যাকে দেখা হয়েছে পুল ফ্যাক্টর হিসেবে) দিকে বেশি মনোযোগী হতে পারেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা (পুশ ফ্যাক্টর) আগে যেমন প্রভাব ফেলত, সামনের দিনগুলোয় তা আর সেভাবে যাতে কাজ না করে, সে প্রত্যাশাই থাকবে বাজারে।’
২৮ দেশ নিয়ে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সম্মিলিত জিডিপিতে জার্মানির হিস্যা প্রায় ২৫ শতাংশ। গত মার্চে দেশটি আর্থিক নীতি পুনর্গঠন করেছে। এতে অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ দেখা দিয়েছে। এটি ইউরোপের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বড় অবকাঠামোর তুলনায় দৈনন্দিন ব্যয়ের দিকে বেশি মনোযোগ জার্মান সরকারের। বিশ্লেষকরা বলছেন, অবকাঠামো প্রকল্প জার্মানি তথা ইউরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা করতে পারত। কিন্তু সেটিতে নজর দেয়া হয়নি।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বার্কলেসের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জার্মানিতে অবকাঠামো ব্যয় বাড়ছে। তবে চলতি ও আগামী বছরজুড়ে এর বিপরীতে সামাজিক ব্যয় আরো দ্রুতগতিতে বাড়বে।
অবকাঠামো ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় জুরিখ ইন্স্যুরেন্স গ্রুপের ইউরোজোন মার্কেট স্ট্র্যাটেজি প্রধান রস হাচিনসন বলেন, ‘জার্মানির বাজেট পরিকল্পনা আমাদের প্রত্যাশার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, জার্মানির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঝুঁকি বেশি। কারণ দেশটি গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল পায়নি। গত সপ্তাহে তিনটি জার্মান অর্থনৈতিক সংস্থা ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে। কারণ দেশটিতে সরকারি ব্যয় প্রত্যাশামাফিক প্রভাব ফেলছে না এবং কাঠামোগত সংস্কারে ধীরগতি রয়েছে।
বছরের শেষার্ধ্বে ইউরোপীয় পুঁজিবাজারের পারফরম্যান্সও খুব একটা সন্তোষজনক নয়। চলতি বছর জার্মান শেয়ারবাজার সূচকগুলো বেড়েছে ২০ শতাংশ। তবে এ ঊর্ধ্বগতিতে দ্বিতীয়ার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) ভূমিকা খুবই সামান্য। বিশ্লেষকরা বলছেন, জার্মানির পদক্ষেপ যদি ঠিক মতো ফল দেখায় এবং বিনিয়োগকারীরা আবার আত্মবিশ্বাসী হন, তাহলে ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে নতুন বিনিয়োগ আসার অনেক সুযোগ তৈরি হবে। এলএসইজির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংকোচনের পর স্টক্স ৬০০-ভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় বাড়লে আগামী বছর বাজার আরো গতি পেতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনের ক্ষেত্রে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিও বিনিয়োগকারীদের মনোবল বাড়াতে সাহায্য করবে। সিটিগ্রুপ জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইকুইটি ফান্ডে পরিচালিত সম্পদ যুদ্ধের শুরু থেকে ১৪ শতাংশ কমেছে।
এছাড়া ইউক্রেন পুনর্গঠনের সুযোগ থেকে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হতে পারবে কিনা, সেদিকেও নজর থাকবে বিনিয়োগকারীদের। দেশটিতে আগামী এক দশকে ৫০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হতে পারে।










