রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় সবক’টি প্রদেশে। এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর অন্যতমটির কেন্দ্র এখন মিয়ানমার। ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে একের পর এক বিধিনিষেধ দিয়ে রেখেছে পশ্চিমারা। ভেঙে পড়েছে সামাজিক প্রায় সবগুলো প্রতিষ্ঠান। দারিদ্র্য ও অপুষ্টির প্রকোপ সর্বত্র। পরিস্থিতিকে আরো সংকটপূর্ণ করে তুলেছে নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন। বিপর্যয়কর এ পরিস্থিতির মধ্যেই মিয়ানমারে সামরিক জান্তা আয়োজিত বিতর্কিত নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরু হচ্ছে আজ।

মিয়ানমারে এর আগে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন দল এনএলডি। কিন্তু দলটি ক্ষমতা গ্রহণের আগেই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের শাসনভার হাতে তুলে নেয় দেশটির সামরিক জান্তা। অং সান সুচিকে আটক করা হয়। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হলে দমন-পীড়নের মাধ্যমে তা থামানোর চেষ্টা চালায় তাতমাদো (মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী)। এতে সংঘাত রূপ নেয় গৃহযুদ্ধে। এ গৃহযুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক বিদ্রোহীদের কাছে বিভিন্ন প্রদেশের বিস্তৃত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সামরিক জান্তা। অভ্যুত্থানের পর এবারই প্রথম নির্বাচনের আয়োজন করছে জান্তা বাহিনী।

যদিও জনপ্রিয় নেত্রীর কারাবাস, সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের বিলুপ্তি এবং মিয়ানমারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল বিদ্রোহীদের দখলে চলে যাওয়ায় দেশটির এবার নির্বাচন ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ’ হবে না বলে আশঙ্কা দেশটির স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অধিকাংশেরই।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়, ‘মিয়ানমারের জেনারেলদের প্রত্যাশা থাকবে, এবারের নির্বাচন তাদের ক্ষমতার দখলকে বৈধতা দেবে। একই সঙ্গে এটি তাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একঘরে হয়ে পড়া ইমেজ পুনরুদ্ধারেও সহায়তা করবে বলে প্রত্যাশা করছেন তারা।’

যদিও মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী তরুণরা সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে সামরিক জান্তার ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না। তাদের একজন পাই (২৫)। অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার থেকে পালাতে হয় তাকে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটিকে তিনি বলেন, ‘এ নির্বাচন মানুষের জন্য নয়। এটি তারা করছে তাদের নিজেদের জন্য। তারা (ক্ষমতাসীন জান্তা) এখন আটকে পড়া ফাঁদ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে।’

বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর অন্যতমটি মোকাবেলা করতে হচ্ছে মিয়ানমারকে। দীর্ঘায়িত গৃহযুদ্ধ এবং বিগত মার্চে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এবং একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশটিকে এমন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন জান্তা মিয়ানমারে সম্ভাব্য এক মারাত্মক খাদ্য সংকট নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও তা প্রকাশ না করতে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে চাপে রেখেছিল। এজন্য মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদক ও সংবাদমাধ্যমের কর্তৃপক্ষ—উভয়ের ওপরই ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয়।

বর্তমানে বিশ্বে ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবেলায় ক্ষতিগ্রস্ত সবচেয়ে কম তহবিল সহায়তাপ্রাপ্ত দেশগুলোর অন্যতম মিয়ানমার। জাতিসংঘের হিসাবে, দেশটিতে সহায়তা যায় প্রয়োজনীয় তহবিলের মাত্র ১২ শতাংশ। মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ারের ভাষ্যমতে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তা কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত মিয়ানমারের জনগণের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

জাতিসংঘের হিসাবে, মিয়ানমারের ৫ কোটি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ২ কোটি মানুষের এখন প্রত্যক্ষ সহায়তা প্রয়োজন। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেককে দারিদ্র্যসীমার নিচে নিয়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের অনুমান অনুযায়ী, ৩৬ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আর সামরিক জান্তার সঙ্গে বিদ্রোহীদের সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে ৬ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি বেসামরিক ব্যক্তি।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে আগামী বছর তীব্র ক্ষুধার মোকাবেলা করতে হবে ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষকে।

দেশটিতে চলতি বছর মারাত্মক অপুষ্টির আশঙ্কায় থাকা শিশুর সংখ্যা প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি, যা গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। দেশটির পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি তিন শিশুর একজন খর্ব ও কৃশকায়। এর মধ্যে জীবন রক্ষাকারী সহায়তার প্রয়োজন হবে ১০ লাখ মানুষের। বর্তমানে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছে দেশটির ১ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি মানুষ। বর্তমানে বৈশ্বিক ক্ষুধার এক বড় হটস্পট হয়ে উঠেছে মিয়ানমার।

বিশ্বব্যাপী সহায়তা প্রয়োজন এমন নাগরিকের সংখ্যায় মিয়ানমার এখন পঞ্চম বৃহত্তম দেশ।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে গেটওয়ে হিসেবে একসময় এ অঞ্চলে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো মিয়ানমারকে। বর্তমানে দেশটির অর্থনীতি ধুঁকছে। গৃহযুদ্ধের অভিঘাতে থমকে গেছে প্রবৃদ্ধি। মূল্যস্ফীতিও ২০ শতাংশের ওপরে টানা অনেকদিন ধরে। ধসে পড়েছে দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। লাখ লাখ মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন সামরিক জান্তার শাসনের বৈধতা দাবিতে কাজে লাগলেও মিয়ানমারের অর্থনীতি ও জনসাধারণের জন্য তা তেমন কোনো সুফল বয়ে আনবে না বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।