এছাড়া ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপেও ব্যাপক হামলা হয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ওই দ্বীপের ৫০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ করেছে। ইরানি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দ্বীপজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচণ্ড আক্রমণের পর ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। ইরানজুড়ে গতকালের হামলায় অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছেন।

এদিকে রাতের মধ্যেই পুরো ইরানি সভ্যতা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেঁধে দেয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে ‘প্রচুর আলোচনা ও দরকষাকষি’ চলছে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান আসবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। তবে প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এখন কেবল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চলছে।

এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাহরাইনের তোলা রেজল্যুশন প্রয়োজনীয় সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছে। ভোটের ফলাফল বলছে, এর পক্ষে ভোট দিয়েছে ১১টি দেশ, বিপক্ষে ভোট দিয়েছে দুটি দেশ এবং ভোটদানে বিরত ছিল দুটি দেশ। এর মধ্যে স্থায়ী সদস্য দুই দেশ চীন ও রাশিয়া এ প্রস্তাবে ভেটো দেয়ায় তা ব্যর্থ হয়। বাহরাইনের উত্থাপিত এ প্রস্তাবটির লক্ষ্য ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আধাসরকারি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় রেললাইন, সেতু ও মহাসড়ক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কাশান শহরের একটি রেলসেতুতে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ। ইসফাহান প্রদেশের উপগভর্নর এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কারাজ শহরের একটি রেললাইনেও বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং সেখানে আহতদের চিকিৎসা দিতে উদ্ধারকর্মীরা কাজ করছেন বলে জানিয়েছে ইরানিয়ান রেডক্রস সোসাইটি। কোম প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের স্থলপথের সেতুগুলোতেও প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে। তাবরিজ-তেহরান মহাসড়কের একটি অংশেও হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের সংকট ব্যবস্থাপনা বিভাগ। এছাড়া আহভাজ শহরের একটি সড়কেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। তাবরিজ ও জানজান সংযোগকারী একটি মহাসড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং কারেহ-চামান-মিয়ানে সড়ক উভয় দিক থেকেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শাহরিয়ার শহরে একটি আবাসিক ভবনে বিস্ফোরক হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন। আলবোর্জ প্রদেশে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় অন্তত ১৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। সব মিলিয়ে মঙ্গলবারের হামলায় এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫-এ দাঁড়িয়েছে। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৬৬৫ জন বেসামরিক নাগরিক।

এদিকে ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করেছে, ইরানের অন্তত আটটি সেতু সেকশনে তারা হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানী তেহরান, কারাজ, তাবরিজ, কাশান ও পবিত্র নগরী কোম। ইসরায়েলের দাবি, ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) লজিস্টিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়ার লক্ষ্যেই এ সুনির্দিষ্ট হামলাগুলো চালানো হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরানের সবচেয়ে বড় পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা ধ্বংস করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে নেতানিয়াহু জানান, তারা পরিকল্পিতভাবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অর্থের উৎস ভেঙে দিচ্ছেন। এক পৃথক বিবৃতিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, তারা ইরানের দুটি বৃহত্তম পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়েছে। ফলে দেশটির ৮৫ শতাংশের বেশি পেট্রোকেমিক্যাল রফতানি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আইডিএফের দাবি, ইরানের আসালুয়ের একটি স্থাপনা দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র হামলার পর বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ। মার্কিন ও ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার দ্বীপটির ৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ জানিয়েছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো দ্বীপে বেশ কয়েক দফা বিমান হামলা চালিয়েছে, যার ফলে সেখানে অসংখ্য বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এ খার্গ দ্বীপ থেকেই ইরানের প্রায় সব তেল রফতানি করা হয়। ফলে এটি দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোর অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

এদিকে দেশজুড়ে সব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারপাশে মানববন্ধন গড়ে তোলার জন্য তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের শাসকরা। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে কাজেরুন কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে শত শত মানুষকে মানবশৃঙ্খল গড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার সময়সীমা ঘনিয়ে আসার মধ্যে ইরানকে গতকাল আবারো কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ রাতে একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনো ফিরিয়ে আনা যাবে না।’ তবে তিনি দাবি করেন, তিনি এমন পরিণতি চান না। ‘আমি চাই না এটা ঘটুক, কিন্তু সম্ভবত তা ঘটবে,’ বলেন তিনি।

ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কঠোর হুমকি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ আইনপ্রণেতারা। ডেমোক্রেটিক সিনেট নেতা চাক শুমার ট্রাম্পকে ‘চরম অসুস্থ মানসিকতার ব্যক্তি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘যে রিপাবলিকানরা এ অযৌক্তিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভোট দিতে অস্বীকার করছেন, তারা সব পরিণতির দায় বহন করবেন।’ হাউজ নেতা হাকিম জেফরিস সতর্ক করেন, ট্রাম্প আমেরিকাকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারেন। কংগ্রেসম্যান জেসন ক্রো বলেন, ‘একটি সভ্যতা ধ্বংসের আহ্বান একটি যুদ্ধাপরাধ।’ কংগ্রেসম্যান জিম ম্যাকগভর্নও এটিকে ফেডারেল ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন।

ট্রাম্পের হুমকির পাল্টা জবাব দিয়েছে তেহরানও। আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের অবকাঠামো এমনভাবে লক্ষ্য করা হবে, যাতে তারা বহু বছর ধরে এ অঞ্চলের তেল ও গ্যাস থেকে বঞ্চিত হয়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও হামলার হুমকি দেয় সংস্থাটি। এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি ইরানি দেশরক্ষায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত এবং তিনি নিজেও দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্র নিশানা করে হামলার হুমকিও দিয়েছে ইরান। ইরানের আধাসরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়, ওপেনএআই, ওরাকল ও এনভিডিয়ার সহযোগিতায় আবুধাবিতে নির্মাণাধীন যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্টারগেট’ এআই কেন্দ্রটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানার আওতায় রয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সি বলেছে, ইরান এ কেন্দ্রটিকে একটি কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পাল্টা জবাব দেয়ার অধিকার ইরান রাখে।

এদিকে গতকাল সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় স্যাটেলাইট টেলিকম অপারেটর থুরায়া টেলিকমিউনিকেশনের একটি প্রশাসনিক ভবনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন পাকিস্তানি নাগরিক আহত হয়েছেন। সৌদি আরব সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৮টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। বাহরাইন নয়টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। ইরাকের কুর্দিস্তানে একটি বাড়িতে হামলায় পেশমেরগার এক যোদ্ধা ও তার স্ত্রী নিহত হয়েছেন।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের এ অভিযানে এ পর্যন্ত ইরানের ১৫৫টির বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করা হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আইআরজিসির সদর দপ্তর, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং ইরানের নৌবাহিনীর জাহাজ ও সাবমেরিন।

ইরানে হামলা জোরদার হওয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। পাকিস্তানের দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা সচল রাখার প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং পাকিস্তান এ আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সতর্ক করে বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে এবং এ যুদ্ধ চলতে থাকলে কারোরই কোনো জয় নেই।