ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ থমাস রবার্ট ম্যালথাস বিখ্যাত জনসংখ্যা তত্ত্ব আঠারো শতকের শেষ ভাগে সামনে এনেছিলেন। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে। এর বিপরীতে জনসংখ্যা বাড়ে জ্যামিতিক হারে। ফলে একসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খাদ্য উৎপাদনকে ছাড়িয়ে যায়। তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসে প্রকৃতি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী, যুদ্ধবিগ্রহ—এমন নানা ঘটনায় প্রাণহানির মাধ্যমে ভারসাম্য ফেরানোর চেষ্টা চলে। তবে এ ধরনের প্রাণহানি কারোরই কাম্য নয়। তাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন।

তবে চাইলেই খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয় না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ গবেষণা ও কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণও জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। তাই বিংশ শতকে এসে ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক জনসংখ্যার জন্য বাড়তি খাবার জোগান দেয়ার চ্যালেঞ্জ আরো কঠিন হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সামনে আনা হয় গ্রিন রেভল্যুশন বা সবুজ বিপ্লবের ধারণা। এ তত্ত্বের প্রবক্তা হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান মার্কিন কৃষি অর্থনীতিবিদ নরম্যান বোরলগ। সবুজ বিপ্লবের ধারণা সামনে আনায় ১৯৭০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান তিনি।

গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও রকফেলার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মেক্সিকোতে পরীক্ষামূলকভাবে সবুজ বিপ্লব ধারণাকে মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়। রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন বাড়ানোয় অল্প সময়ের মধ্যে তা পুরো বিশ্বে জনপ্রিয়তা পায়। নরম্যান বোরলগের মতে, সবুজ বিপ্লব মূলত বৈশ্বিক কৃষি খাতে নতুন প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার কথা বলে। বাড়তি জনসংখ্যার খাবারের চাহিদা মেটাতে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব না হলে বিশ্ববাসী বড় ধরনের দুর্ভিক্ষের কবলে পড়বে।

এ পরিস্থিতি এড়াতে উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং সর্বাধুনিক সেচ ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে দেশে দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টাই সহজ ভাষায় সবুজ বিপ্লবের সারকথা। এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের (প্রধানত উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশ) কৃষিতে অল্প সময়ের মধ্যে বিরাট সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। বেড়েছে কৃষি উৎপাদন। পৃথিবীর মানুষ সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেয়েছে।

তবে কৃষিকে বদলে ফেলার স্লোগান দিয়ে সবুজ বিপ্লবকে আমাদের সামনে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, ধারণাটি কি বাস্তবে ঠিক সেভাবেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে? এর নেতিবাচক দিকগুলো কি বড় ক্ষতির কারণ হয়নি? এমন নানা প্রশ্ন কয়েক দশক ধরে মানুষের মনে উঁকি দিয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পুরো প্যাকেজটির ওপর নজর দেয়া যেতে পারে। এতে কৃষি ব্যবস্থার জন্য সম্পূর্ণ নতুন কিছু উপাদান (উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, সেচযন্ত্র) যুক্ত করা হয়েছে। এসব উপাদান চিরাচরিত প্রাকৃতিক কৃষিকে পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছে। উৎপাদন বাড়ালেও মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে মানুষ ফের প্রাকৃতিক কৃষির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। বিশেষত কীটনাশক, রাসায়নিক সারের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি সবুজ বিপ্লবের ধারণার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সবুজ বিপ্লবের তত্ত্ব জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বীজের (জিএমও) ধারণা জনপ্রিয় করেছে। আগে কৃষকরা এক বছরের বীজ রেখে দিয়ে পরের বছর আবাদ করতেন। জিএমও বীজ চাইলেও পরের বছর আবাদ করা যায় না। ফলে কোম্পানিগুলোর কাছে বছর বছর কৃষকরা জিম্মি হয়ে পড়েন। আজকাল আবার এমন কিছু জিএমও ফসল উৎপাদন হচ্ছে, যেগুলো চাষের সময় কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। বীজের উৎপাদন পর্যায়ে কীটনাশক দেয়া থাকে। মানবদেহের জন্য এটা আরো বেশি ক্ষতিকারক। ফলে এ ধরনের উচ্চফলনশীল বীজ উৎপাদন বাড়ালেও আমাদের হাজার বছরের কৃষিজ ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসার পথ প্রশস্ত করেছে।

সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে কৃষকের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এ দুটো উপাদানের ব্যবহার প্রতি বছরই উত্তরোত্তর বাড়াতে হয়। ফলে মাটির গুণাগুণ ও উর্বরা শক্তি ক্রমে কমে আসে। একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে এটা বোঝানো যায়। শিম জাতীয় উদ্ভিদ বাতাস থেকে নাইট্রোজেন শোষণ করে মাটিকে সরবরাহ করে। এ কারণে আগে ক্ষেতে অন্যান্য ফসলের সঙ্গে শিম গাছ লাগানো হতো। এখন জমিতে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সার ব্যবহার করা হয়। ফলে গাছ সবুজ হচ্ছে ঠিকই, তবে মানবদেহে মাত্রাতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রবেশ করায় ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।

সহজ ভাষায় কীটনাশক মানে হলো বিষ। এ বিষ মানবদেহের জন্য স্লো পয়জনিং হিসেবে কাজ করে। ডিডিটি ও পিসিবি জাতীয় কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মানুষের মধ্যে ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট, লিভারের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কীটনাশক শুধু বেছে বেছে ক্ষতিকর পোকাদের মারে না; বরং প্রজাপতি, মৌমাছি ও বিভিন্ন পাখিসহ পতঙ্গ, প্রাণী এবং জলজ উদ্ভিদের বিলুপ্তির পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। কৃষির এ আধুনিকতা মানুষসহ পুরো প্রতিবেশকে হুমকিতে ফেলেছে।


অনেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নয়া উপনিবেশবাদের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করে সবুজ বিপ্লবকে। ষাটের দশকের দিকে একটি ধারণার ওপর খুব জোর দেয় সাবেক ঔপনিবেশিক দেশগুলো। তা হলো—‘পৃথিবীতে মানুষ বাড়ছে, কৃষিজমি কমছে। তাই কৃষিতে বিপ্লব আনতে হবে।’ এ ধারণার বাস্তবায়ন করে সবুজ বিপ্লব। বিশেষত সদ্য স্বাধীন হওয়া অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষি ব্যবস্থাকে পাল্টে দিতে এগিয়ে আসে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। এসব দেশের কৃষি খাতে একের পর এক শর্তযুক্ত ঋণ দেয়া হয়। পশ্চিমা দেশগুলোর মালিকানাধীন কোম্পানি নতুন নতুন কৃষিপণ্য, উচ্চফলনশীল বীজ, কীটনাশক, রাসায়নিক সার নিয়ে হাজির হয় উন্নয়নকামী কৃষকদের কাছে। নয়া ঔপনিবেশিকতার ফাঁদে পড়ে এসব দেশ।

সবুজ বিপ্লব বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন বাড়িয়েছে। মানুষের মুখে খাবার তুলে দিয়েছে। তবে দেরিতে হলেও মানুষ সবুজ বিপ্লবের ফাঁদের বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে। আবেদন কমতে শুরু করেছে এক সময়ে আলোড়ন তোলা এ তত্ত্বের। এখন মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়েছে। খাবার খাওয়ার আগে এর নিরাপদ উৎস নিয়ে মানুষ ভাবতে শুরু করেছে। বিশ্বজুড়ে মানুষ কীটনাশক ও রাসায়নিক সার মুক্ত খাবার খুঁজছে। এ প্রবণতা দেশে দেশে প্রাকৃতিক কৃষির পুনর্জাগরণে ভূমিকা রাখছে।

তবে চ্যালেঞ্জটি হলো, এরই মধ্যে কৃষকরা রাসায়নিক সার, কীটনাশক, উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। চাইলেও তাদের এ অভ্যস্ততা রাতারাতি পাল্টে ফেলা সম্ভব না। এক্ষেত্রে যেটা করা যেতে পারে তা হলো—এসব ক্ষতিকারক উপাদানের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা। জমিতে জৈব সার ও জৈব কীটনাশকের (নিমপাতার রস, ফেরোমন ট্র্যাপ) ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।

দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাটি আজ মৃতপ্রায়। প্রাকৃতিক কৃষিই পারে সেই মাটিকে নতুন করে জীবন ফিরিয়ে দিতে। সেই সঙ্গে মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণীসহ পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে সম্ভাব্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

 

আঁখি আক্তার, সদস্য, প্রকৃতি বীক্ষণ