গাজীপুরের শ্রীপুর ও কাপাসিয়া উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে প্রমত্তা শীতলক্ষ্যা। স্থানীয় প্রাণ-প্রতিবেশ ও কৃষিতে এ নদীর অবদান অনেক। বর্ষা শেষে শীতলক্ষ্যার পলি আশপাশের জমিকে করে তোলে উর্বর, যা কৃষিকাজের জন্য উপযুক্ত। শীতলক্ষ্যার বুক চিরে জেগে ওঠা চরের জমিও বেশ উর্বর। মৌসুমি ফসল জন্মায় চরের উর্বর জমিতে। নদীবিধৌত এসব জমিতে এখন স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। সফলতাও মিলেছে। এ ধারাবাহিকতায় সংশ্লিষ্ট এলাকার অনেক কৃষক স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক আবাদে ঝুঁকতে শুরু করেছেন।
কাপাসিয়ার সিংহশ্রী ইউনিয়নের ছোট্ট একটি গ্রাম কুড়িয়াদী। এ গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। এখানকার তরুণ কৃষক তোফায়েল আহমেদ বিদ্যুৎ স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেছেন। তিনি জানান, আগে গ্রামের কিছু কৃষক চরের জমিতে ও নদীর তীরে শীতকালীন ফসল ও সবজি চাষ করতেন। তবে বেশির ভাগ জমিই পতিত থাকত। চাষাবাদে ভিন্নতা আনতে এবং পতিত জমির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবারের মৌসুমে গ্রামের কয়েকজন তরুণ কৃষক স্ট্রবেরি আবাদ শুরু করেছেন। অল্প সময়ের মধ্যে সফলতাও মিলেছে।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, বর্ষা মৌসুম শেষে নদীর পানি নেমে যায়। জমে থাকা পলিমাটি থাকে খুবই উর্বর। যে ফসলের চাষ করা হয়, তাতেই মেলে সফলতা। ফলে সবজি থেকে শুরু করে স্ট্রবেরি—সবকিছুর বাড়তি উৎপাদন হয় এ অঞ্চলে। বিশেষত শীতলক্ষ্যা নদীর আর্দ্র বাতাস ও আবহাওয়া ফলটির উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
শুরুতে এক হাজার চারা লাগিয়ে শীতলক্ষ্যার চরে স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষাবাদের সূচনা করেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি প্রতিটি স্ট্রবেরির চারা ৩০ টাকা দরে কিনে আনেন। কয়েক মাসের পরিচর্যায় গাছে ফল আসতে শুরু করে। কার্যকর আবহাওয়া ও বাড়তি যত্নে লালরঙা স্ট্রবেরিতে ভরে ওঠে একেকটি গাছ। ফলের স্বাদও তুলনামূলক ভালো। বাজারে চাহিদাও রয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি স্ট্রবেরি ৭০০-৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন। আবাদের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তোফায়েল আহমেদ প্রায় দেড় লাখ টাকার স্ট্রবেরি বিক্রি করেছেন।
শুধু তোফায়েল আহমেদ বিদ্যুৎ নন, তার পাশাপাশি স্থানীয় আরো অনেকেই শীতলক্ষ্যার চরের জমিতে কিংবা নদীতীরে স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেছেন। সফলতাও পেয়েছেন। এমন দুজন কৃষক আব্দুর রাজ্জাক প্রধান কাজি ও হুমায়ুন কবির। এর মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক সাত হাজার স্ট্রবেরির চারা লাগিয়েছেন। হুমায়ুন কবির লাগিয়েছেন ১৩ হাজার স্ট্রবেরির চারা। গাছে ফলনও এসেছে বেশ। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত স্ট্রবেরি বিক্রি শুরু করেছেন দুজন।
হুমায়ুন কবির বলেন, বর্ষা মৌসুমের পর থেকে শীতলক্ষ্যার চর ও নদীর তীরে ফল চাষ করা হয়। তবে অনেক সময় লোকসানের মুখে পড়তে হয়। গত মৌসুমেও পেঁপে বাগান করে আর্থিকভাবে লোকসান হয়েছিল। এবার আর পেঁপে চাষ করিনি। অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই কয়েকজন মিলে স্ট্রবেরির গাছ লাগিয়েছিলাম। আশানুরূপ সাড়া পেয়েছি। চর ও নদীতীরের পতিত জমিতে ফলটির ভালো ফলন হয়েছে। বিক্রি করে বাড়তি আয় হয়েছে। এখন আমাদের দেখে আশপাশের অনেকেই স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। অনেকেই পরের মৌসুমে ফলটি চাষ করবেন বলে জানিয়েছেন। ফলে গাজীপুরের শীতলক্ষ্যার পাড়ে স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষ সম্ভাবনাময় কৃষি খাত হিসেবে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করছে।
১৭ শতকে ফ্রান্সে স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক আবাদের সূচনা। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফলটির চাষাবাদ জনপ্রিয়তা পায়। তবে আমাদের দেশে স্ট্রবেরির চাষাবাদের ইতিহাসে খুব একটা পুরনো নয়। শীতকালে যেসব জেলার তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকে, সেসব জেলায় স্ট্রবেরি চাষ হয়। আমাদের দেশে বারি-১ জাতের স্ট্রবেরি চাষ হয়। অনেকেই শখের বশে বাড়ির আঙিনা কিংবা ছাদে স্ট্রবেরি চাষ করেন। এখন ফলটির বাণিজ্যিক চাষ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। দেশে ফলের রস, আইসক্রিম, জ্যাম, জেলি তৈরির কারখানাগুলোয় স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাহিদা রয়েছে।
গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মাহবুব আলম বলেন, স্ট্রবেরিতে উচ্চমাত্রায় পুষ্টিমান বিদ্যমান। এ ফল রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রোগমুক্তিতে সহায়তা করে। গাজীপুর জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে স্ট্রবেরির চাষ হলেও এখনো এর সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। বাসাবাড়ি ছাড়িয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে স্ট্রবেরির বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে। এ উদ্যোগ সেখানকার গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির কাঠামো বদলে দেবে। আয় বাড়াবে স্থানীয়দের।
মো. হাজিনুর রহমান শাহীন, গাজীপুর





