সাব্বির হাসান নাসির
নির্বাহী পরিচালক
এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেড
বিশ্বজুড়েই নভেল করোনাভাইরাস প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করছে। তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রিটেইলশপগুলোতেও। তবে এক্ষেত্রে বলে রাখি, আমরা সুপারশপ শুধু ব্যবসা হিসেবে দেখি না। বরং মানুষকে সেবা প্রদানের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করি এবং সেভাবে পরিচালনা করি। বিশেষ করে মার্চের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে আউটব্রেক হওয়ার পর থেকে গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত প্যানিক বায়িং (আতঙ্কে কেনাকাটা) করে গ্রাহক। সে সময় কিছু পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায় এবং দামও বাড়ে। আমাদের জন্য সে সময় একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা।
এছাড়া আপনারা জানেন, আমাদের ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ রয়েছে। যেটা অন্যান্য সাধারণ দোকানে দিতে হয় না। আমরা সবসময়ই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করি। মানের দিক থেকে সেরাটা গ্রাহককে দেয়ার চেষ্টা থাকে। সরকার আমাদের এখানে গভর্ন্যান্সের ব্যবস্থা রেখেছে। আমাদের অল্প কিছু রিটেইল চেইনকে যেভাবে তত্ত্বাবধান করা সহজ, ১০ লাখ দোকানকে সেভাবে নিয়ন্ত্রণ কিন্তু সহজ নয়। এসব কারণে সরকারি তত্ত্বাবধান এখানে প্রতিষ্ঠা করা যায়। সরকারের পাশাপাশি আমরা সবসময় পণ্যের মান ও দাম যেন স্থিতিশীল থাকে, সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। এখন এ দুর্যোগের সময়ও কিন্তু যে পরিমাণ সরবরাহ আমরা নিশ্চিত করছি, সেটা আমাদের বাইরের বাজারগুলো করতে পারে না। আমরা যেমন জনগণকে সেবা দিচ্ছি, অন্যদিকে সরকারকেও রাজস্ব দিচ্ছি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুপারশপে ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত ভ্যাট দেয়াটা একটা অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে, যা আমাদের কাজ করার ক্ষেত্রটিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে। ভ্যাট যদি সরিয়ে দেয়া যায়, তাহলে আরো বৃহৎ পরিসরে জনগণকে আমরা সেবা দিতে পারব। কারণ এখন সুপারশপে কেনাকাটা করা মানুষের সিংহভাগই কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। তাদের জন্য ৫ শতাংশ ভ্যাট একটা অতিরিক্ত চাপ। এ ধরনের দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ভ্যাটের কারণে চাপটা আরো বেড়ে গিয়েছে। আগামী দিনগুলোয় যে ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার আমরা আশঙ্কা করছি, তাতে ৫ শতাংশ ভ্যাটটা রাখা ঠিক হবে না। এ সময়ে ভ্যাট তুলে নিলে জনসাধারণের ওপর বাড়তি চাপটা কমে যাবে। এছাড়া আমরা মনে করি, ভ্যাট তুলে নিলে নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে সব অর্থনৈতিক শ্রেণীর মানুষই আমাদের সেবা নেয়ার সুযোগ পাবে।
সুপারশপে মূল্য বেশি, এটা কিন্তু একটা ভুল ধারণা। সুপারশপে অনেক পণ্য রয়েছে, যার মূল্য বাইরের দোকানগুলোয় অনেক বেশি। যেমন এখনো যদি দেখেন স্বপ্নে চাল বা পেঁয়াজের মূল্য বাইরের দোকানের চেয়ে কম। এছাড়া সুপারশপে অনেক অফার থাকে। ফলে সার্বিকভাবে দেখা যায়, গ্রাহকের লাভ হচ্ছে। করোনাভাইরাসের দুর্যোগটির মূলে কিন্তু স্বাস্থ্যগত দুর্যোগ। যেখানে পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুমুক্ত থাকাটাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক। এর সঙ্গে রয়েছে নিরাপদ খাদ্যপণ্যের প্রতিশ্রুতি। বর্তমান দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সাধারণ বাজারগুলোর তুলনায় সুপারশপগুলোয় কেনাকাটা করা অনেক বেশি নিরাপদ। যেকোনো স্বপ্ন আউটলেটে গেলে দেখা যাবে, প্রত্যেক ক্রেতাকে আমরা স্যানিটাইজ করার পর প্রবেশাধিকার দিই। কর্মীরা সবাই মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করছেন এবং তারা নিজেরাও জীবাণুমুক্ত থাকতে প্রতি ঘণ্টায় নিজেদের স্যানিটাইজ করছেন। আমাদের পণ্য বিতরণের প্রতিটি ক্ষেত্রে জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। এছাড়া এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক কর্মীর মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার বাধ্যতামূলক। আউটলেটগুলোয় কাস্টমারদের দূরত্ব নিশ্চিত করতে চিহ্ন দেয়া আছে। সার্বিকভাবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজার করতে সুপারশপ সাধারণ বাজারের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ। তবে শুধু এই সংকটকেই নয়, স্বাভাবিক সময়েও আমরা কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই। পরিচ্ছন্নতার কাজে ফিল্টারে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করি আমরা। এ চর্চা কাঁচাবাজারে একদমই অনুপস্থিত। আমরা মাছ-মাংস-সবজি রক্ষণাবেক্ষণে যে তাপমাত্রা ব্যবহার করি, তা সাধারণ কাঁচাবাজারে কখনই করা হয় না। আমার মনে হয়, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, জীবাণুমুক্ত রাখার যে বিষয়গুলো বলা হচ্ছে, সেগুলো সবই মেনে চলা হয় সুপারশপে।
নিত্যপণ্যের বিষয়ে বলব, আমরা কৃষক পর্যায় থেকে ধান সংগ্রহের পর চাল তৈরি করে বিক্রি করি। হঠাৎ করে চালের চাহিদা বৃদ্ধিতে আমরা সেই পরিমাণ ধান সংগ্রহ করতে পারছি না। এ কারণে এখন মিলারদের কাছ থেকে চাল কিনতে হচ্ছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চালের দাম কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছেন মিলাররা। তাই বেশি টাকা দিয়ে চাল কেনার কারণে একটু বেশি দামে বিক্রিও করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা চালের মিলারদের সঙ্গে আলোচনা করে দাম নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি। এছাড়া সংকটকালে ক্রেতারাও যাতে বেশি চাল মজুদ করতে না করে, সেজন্য একজন ক্রেতার কাছে ১০ কেজির ওপরে চাল বিক্রি করছি না। আমরা সব ধরনের ক্রেতার চাহিদা মাথায় রেখে কাজ করছি। ভবিষ্যতেও কোনো ধরনের সংকট তৈরি হলে আমরা এ ধরনের ব্যবস্থা নেব।
যেসব এলাকা থেকে আমরা চাল বা সবজি কিংবা অন্য পণ্য নিয়ে আসি, সেসব এলাকা লকডাউনের মধ্যেও যাতে পণ্যবাহী গাড়ি ঢাকায় আসতে পারে, এ ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। যেমন কুষ্টিয়া, দিনাজপুর থেকে চাল আসে। এসব এলাকায় লকডাউনের সময় অবশ্যই পণ্যবাহী গাড়ির চলাচল বাধাহীন থাকতে হবে। সরকার যদি এ ব্যবস্থা করতে না পারে, তাহলে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা কিন্তু অসম্ভব হবে। সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, লকডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও সারা দেশে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে হবে।
হেক্সিসল ও স্যানিটাইজার যেসব কোম্পানি উৎপাদন করছে, তাদের একটি উৎপাদনের লক্ষ্য থাকে। সেই চাহিদা অনুযায়ী তারা পণ্য তৈরি করে। করোনার প্রভাবে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে। হঠাৎ করেই আবার এসব জোগান দেয়া সম্ভব হয় না। বাংলাদেশে প্রথম আউটব্রেক হওয়ার দিন থেকেই এসব পণ্যের চাহিদা যেমন বেড়ে যায়, ক্রেতারাও অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংগ্রহ করা শুরু করে। বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ম করে দিই যে একজন ক্রেতা একটির বেশি স্যানিটাইজার কিনতে পারবেন না। এসব পণ্যের কাঁচামাল বিদেশ থেকে নিয়ে আসা হয়। চাইলেই চাহিদা অনুযায়ী কাঁচামাল পাওয়া সম্ভব নয়। তবে আমাদের কাছে যে পরিমাণ কাঁচামাল ছিল, সেটা দিয়েই প্রতিনিয়ত উৎপাদন বাড়িয়েছি। এসিআই ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি থেকেও এসব পণ্য নিয়ে এসে স্বপ্নে বিক্রি করার ব্যবস্থা রেখেছি।
বর্তমান অবস্থায় অফলাইনের মতো অনলাইনেও স্বপ্ন সুপারশপের বিক্রি বেড়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে মানুষ যেন বাসায় বসে সহজে পণ্য পেতে পারে, সেটা মাথায় রেখে আমরা সব রকম ব্যবস্থা নিয়েছি। এরই মধ্যে এ ডেলিভারির কাজে ফুডপান্ডা ও পাঠাও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং আরো অনেক প্রতিষ্ঠানও যুক্ত হচ্ছে।
সুপারশপের বাজারে স্বপ্নের অবস্থা বলতে হবে ‘টেকসই’। সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দারিদ্র্য বিমোচনেও কাজ করছে স্বপ্ন। আমারা উন্নত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও জ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে কৃষকদের স্বাবলম্বী করে তুলছি। তেমনি হাজার তরুণ-তরুণীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহকের কাছে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছে দেয়াই স্বপ্নের লক্ষ্য। দেশে স্বপ্ন এখন মার্কেট লিডার। গত বছর আন্তর্জাতিকসহ দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে স্বপ্নের অবস্থান ছিল অষ্টম। এর কারণ একটাই, আমরা জনগণের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা সবসময় জনগণের সুবিধার কথা মাথায় রেখে কাজ করি। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের ক্রেতাদের বিশ্বাস ও আস্থাই আমাদের এ অর্জনের অংশীদার।
পণ্যের মান নিশ্চিতে আমাদের একটি শক্তিশালী কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স টিম রয়েছে। তারা প্রতিনিয়ত স্বপ্নের পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। এখানে সবজি ও মাছের ৫০ শতাংশই কিন্তু সরাসরি চাষীদের কাছ থেকে আসে। তাদের আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি কীটনাশকের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে এবং ক্ষতিকারক কীটনাশক এড়িয়ে যেতে। আউটলেটে প্রবেশের আগে আবার দেখে নেয়া হয় পণ্যের মান ঠিক আছে কিনা। কোনো সবজি পচে যাচ্ছে কিনা, সেটাও আমরা দেখি। ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রায় রেখে আমরা মাংস বিক্রি করি।
আমরা সবসময় অন্যান্য ব্যবসায়ীর চেয়ে কম দামে ক্রেতাদের হাতে পণ্য তুলে দেয়ার চেষ্টা করি। যদি হোলসেল পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে দেয়, সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার থাকে না। হঠাৎ করে চাহিদা বেড়ে গেলে আমরা এসব পণ্য হোলসেলারদের থেকে নিয়ে আসি। তারা যদি দাম বাড়ান, তাহলে আমাদের কিছু করার থাকবে না। সেক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে হোলসেলার পর্যায়ে দাম নিয়ন্ত্রণ রাখা।





