সদ্য বিদায়ী
বছরের শেষের
দিকে বিশ্বের
শেয়ারবাজারগুলো, বিশেষ
করে মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার
নতুন উচ্চতায়
পৌঁছেছে। নভেল
করোনাভাইরাসের টিকা
প্রয়োগের সূত্রে
আশার সঞ্চার
হয়েছে। ধারণা
করা হচ্ছে,
শিগগিরই হয়তো
বিশ্ব অর্থনীতি
ভি-আকৃতির
পুনরুদ্ধার হতে
যাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে
খুবই উন্নত
রাষ্ট্রগুলোর প্রধান
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো
অতিনিম্ন নীতি/সুদহার
বজায় রাখার
পাশাপাশি অপ্রচলিত
আর্থিক ও
ঋণ নীতি
গ্রহণ, স্টক
ও বন্ড
ক্রয় করার
ক্ষেত্রে উৎসাহ
প্রদান করেছে।
কিন্তু এ
প্রবণতায় ওয়াল
স্ট্রিট ও
মেইন স্ট্রিটের
মধ্যে দূরত্ব
কমে গেছে।
ফলে বাস্তব
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার
হয়েছে কে-আকৃতিতে।
হোয়াইট কলার
যারা বাসা
থেকে কাজ
করতে পারছেন,
তাদের আয়
স্থিতিশীল আছে
এবং বিদ্যমান
আর্থিক উৎস
থেকে অর্থ
উত্তোলন করতে
পারছেন তারা
ভালো আছেন।
অন্যদিকে যারা
বেকার অথবা
আংশিকভাবে স্বল্প
বেতনের চাকরি
করছেন তারা
মানবেতর জীবন
যাপন করছেন।
তাই ধারণা
করা যায়,
২০২১ সালে
এ মহামারী
ব্যাপক পরিসরে
সামাজিক অস্থিরতা
তৈরি করবে।
বছরজুড়েই চলমান
কভিড-১৯
সংকট ঘনীভূত
হয়েছে। ৮৪টি
স্টক মার্কেটের
মোট সম্পদের
মালিক ১০
শতাংশ শেয়ারহোল্ডার
(যার ৫১
শতাংশের মালিক
আবার ১
শতাংশ শেয়ারহোল্ডার),
অন্যদিকে তলানির
৫০ শতাংশের
উল্লেখযোগ্য কোনো
স্টক নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ
৫০ বিলিয়নেয়ার
মোট জনসংখ্যার
একীভূত সম্পদের
অর্ধেকের বেশি
সম্পদের মালিক।
সম্পদ অর্জনের
এ গতিকে
কভিড-১৯
আরো ত্বরান্বিত
করেছে। কেননা
মেইন স্ট্রিটের
জন্য যা
দুর্ভাগ্য ওয়াল
স্ট্রিটের জন্য
সেটাই সৌভাগ্য।
ভালো বেতনের
স্থায়ী চাকরির
পরিবর্তে ফ্রিল্যান্স,
পার্ট টাইম
অথবা ঘণ্টা
চুক্তিতে নতুন
কর্মী নিয়োগের
মধ্য দিয়ে
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের
লভ্যাংশ ও
স্টকের দাম
বাড়াচ্ছে। কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা ও
মেশিন লার্নিং
(এআই/এমএল)
বিস্তারের পাশাপাশি
শ্রম প্রতিস্থাপন,
মূলধন নিবিড়
ও দক্ষতাভিত্তিক
প্রযুক্তি ব্যবহারের
এ ধারা
সময়ের সাথে
বাড়বে।
উদীয়মান বাজার
ও উন্নয়নশীল
রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে
কভিড-১৯
যে মন্দা
সৃষ্টি করেছে
তা বিশ্বব্যাংকের
ভাষায় ‘প্যানডেমিক
ডিপ্রেশন’।
অর্থাৎ এক
ধরনের হতাশার
মহামারী মূল
ভাইরাসের মতো
ছড়িয়েছে। ১০০
কোটির বেশি
মানুষকে দারিদ্র্যসীমার
নিচে ঠেলে
দিয়েছে, যাদের
দৈনিক আয়
এখন দুই
ডলারের নিচে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি
২০২০ সালের
প্রথমার্ধে ক্রমাগত
নিম্নমুখী ছিল,
কিন্তু তৃতীয়
প্রান্তিকে এসে
ভি-আকৃতির
পুনরুদ্ধার হচ্ছে,
সেটাও সম্ভব
হয়েছে বেশির
ভাগ অর্থনীতির
দরজা দ্রুত
খুলেছিল বলে।
চতুর্থ প্রান্তিকে
পুনরায় কঠোর
লকডাউন আরোপ
হওয়ার কারণে
ইউরোপ ও
যুক্তরাজ্যের বাজার
ডব্লিউ-আকৃতির
ডাবল-ডিপ
মন্দার দিকেই
এগোচ্ছে। এমনকি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও
যেখানে মহামারীজনিত
নতুন বাধ্যবাধকতা
নিয়ে রাজনৈতিকভাবে
খুব তোড়জোড়
নেই, সেখানেও
তৃতীয় প্রান্তিকে
৭ দশমিক
৪ শতাংশ
প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
চলতি বছরের
শেষ প্রান্তিকে
সর্বোচ্চ শূন্য
দশমিক ৫
শতাংশ প্রবৃদ্ধি
হবে বলে
মনে করা
হচ্ছে, যা
আগামী বছরের
প্রথম প্রান্তিকেও
একই থাকবে।
পুনরুদ্ধারের চিত্রটি
দেখতে খুব
সাধারণ ইউ-আকৃতির
মতো হবে।
মার্কিন পরিবারগুলোকে
নতুনভাবে ঝুঁকি
মোকাবেলা করতে
হচ্ছে, যার
অর্থ হচ্ছে
তারা ব্যয়
কমিয়ে ফেলছে।
ফলে কর্মসংস্থান,
উৎপাদন ও
মূলধন ব্যয়
কমছে। করপোরেট
খাতে উচ্চঋণের
বোঝা এবং
বেশির ভাগ
পরিবার তাদের
সম্পদ বিক্রি
করছে। এতে
ব্যয় কমবে,
ঋণ খেলাপি
বাড়বে। ফলে
তা এক
ধরনের ঋণ
সংকট তৈরি
করবে এবং
এর প্রভাব
পড়বে ব্যাংক
খাতে।
২০১৯ সালে
বিশ্বব্যাপী সরকারি
ও বেসরকারি
খাতের ঋণের
পরিমাণ ছিল
মোট জিডিপির
৩২০ শতাংশ,
যা ২০২০
সালের শেষে
দাঁড়াবে ৩৬৫
শতাংশ। এখন
পর্যন্ত কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের সহজ
শর্তের নীতিমালার
কারণে বিভিন্ন
সংস্থা, পরিবার,
আর্থিক প্রতিষ্ঠান,
স্বায়ত্তশাসিত এমনকি
রাষ্ট্রগুলোও দেউলিয়াত্বের
স্রোত থেকে
রক্ষা পেয়েছে।
কিন্তু চীন-আমেরিকার
বৈরী সম্পর্ক
ও নেতিবাচক
সরবরাহ শৃঙ্খলের
প্রভাবের কারণে
এ ধরনের
স্বল্পমেয়াদি সমাধান
অনেক রাষ্ট্রকেই
উচ্চমূল্যস্ফীতির দিকে
ধাবিত করবে।
বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের
চিত্রটি ডব্লিউ
কিংবা ইউ-আকৃতির
হলেও তাতে
দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত
চিহ্নটি থাকবে।
মূলধন ব্যয়
কমে যাওয়ার
ফলে সম্ভাব্য
উৎপাদন কমবে।
যেসব শ্রমিক
কাজ হারিয়েছেন
কিংবা বেকার
আছেন তাদের
ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান
হওয়ার সম্ভাবনা
কমে যাবে।
এ ধরনের
পরিস্থিতি রাজনৈতিক
প্রতিক্রিয়ায় ‘পূর্বশর্ত’
হিসেবে যুক্ত
হয়ে বাণিজ্য,
অভিবাসন, বিশ্বায়ন
ও উদার
গণতন্ত্রের মতো
শর্তগুলোকে ক্ষুণ্ন
করবে।
কভিড-১৯
ভ্যাকসিন চলমান
দুর্দশার উন্নয়ন
ঘটাবে না;
এমনকি সবচেয়ে
দ্রুততম সময়ে
৭৭০ কোটি
মানুষের কাছে
সমানভাবে ভ্যাকসিন
পৌঁছলেও না।
খুব জোর
দিয়ে বলা
উচিত নয়,
কিন্তু অবকাঠামোগত
সক্ষমতা (কোল্ড
স্টোরেজ), ‘ভ্যাকসিন
জাতীয়তাবাদ’-এর
উত্থান ও
গুজবের মতো
বিষয়গুলো জনমানুষের
মাঝে ভ্যাকসিন
ভীতি তৈরি
করবে। উপরন্তু
নেতৃস্থানীয় ভ্যাকসিনগুলো
৯০ শতাংশের
বেশি কার্যকর
বলা হলেও
তা প্রাথমিক
ও অসম্পূর্ণ
তথ্যের ওপর
ভিত্তি করে
তৈরি করা
হয়েছে। আমি
যেসব বিজ্ঞানীর
সঙ্গে কথা
বলেছি তাদের
মতে, প্রথম
প্রজন্মের ভ্যাকসিন
যদি ৫০
শতাংশের বেশি
কার্যকর হয়,
তবু আমরা
নিজেদের ভাগ্যবান
বলতে পারি।
প্রকৃতপক্ষে অনেক
বিজ্ঞানী এ
৯০ শতাংশ
কার্যকারিতার বিষয়ে
সংশয় প্রকাশ
করেছেন।
এর চেয়েও
বিপদের কথা,
২০২১ সালের
শেষ নাগাদ
কভিড-১৯-এর
প্রকোপ আবারো
বাড়বে, যখন
ভ্যাকসিন গ্রহণ
করা মানুষগুলো
মাস্ক ছাড়া
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে
অংশগ্রহণ করবে।
এ ভ্যাকসিন
যদি ত্রাণকর্তা
হয় তাহলে
কেন ফাইজারের
প্রধান নির্বাহী
ভ্যাকসিন বাজারে
ছাড়ার ঘোষণার
দিন তার
মিলিয়ন ডলারের
শেয়ার ছেড়ে
দিলেন?
সর্বশেষ এ
বছরের সবচেয়ে
বড় রাজনৈতিক
ঘটনা ছিল
মার্কিন নির্বাচনে
জো বাইডেনের
জয়লাভ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে
অর্থনীতিতে এটি
কোনো বড়
ধরনের পার্থক্য
তৈরি করবে
না। সময়ের
সাথে বড়
ধরনের কোনো
নীতি পরিবর্তন
দরকার হলেও
কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের
সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেকোনো
প্রচেষ্টাকে আটকে
দেবে। বাইডেন
কোনোভাবেই সবুজ
অবকাঠামো গড়তে
বৃহৎ বিনিয়োগ,
করপোরেশন ও
বিত্তশালীদের ওপর
কর বৃদ্ধি
কিংবা ট্রান্স-প্যাসিফিক
পার্টনারশিপের মতো
সফল কোনো
বাণিজ্য চুক্তিতে
যুক্ত হতে
পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা
করছে প্যারিস
জলবায়ু চুক্তিতে
পুনরায় যুক্ত
হতে এবং
জোটের সম্পর্ক
পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।
কিন্তু নবনির্বাচিত
সরকার কতটুকু
সফল হতে
পারবে সে
বিষয়ে সংশয়
থেকেই যাচ্ছে।
চীন ও
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে
চলমান শীতল
যুদ্ধ আরো
ঘনীভূত হবে,
যা তাইওয়ানে
সামরিক সংঘাত
অথবা দক্ষিণ
চীন সাগরে
চীনের আধিপত্য
বিস্তারের দিকে
পরিস্থিতিকে ধাবিত
করবে। বেইজিং
কিংবা ওয়াশিংটনে
যেই ক্ষমতায়
থাকুক ‘থুসিডাইডিস
ট্র্যাপ’ এরই
মধ্যে বিস্তৃত
হয়েছে। ফলে
উদীয়মান/নতুন
শক্তি ও
ক্ষমতাসীন শক্তির
মধ্যকার সংঘাতের
মঞ্চ প্রস্তুত
করেছে কোনো
ধরনের আধিপত্যের
সুযোগ না
রেখেই। ভবিষ্যতের
শিল্পগুলোকে নিয়ন্ত্রণের
প্রতিযোগিতা আরো
তীব্র হওয়ার
সাথে সাথে
ফাইভজি, এআই/এমএল,
বিগ ডাটা,
ইন্টারনেট অব
থিংস, কম্পিউটার
চিপস, অপারেটিং
সিস্টেম এবং
অন্যান্য প্রথম
সারির প্রযুক্তিনির্ভর
ডাটা, তথ্য
ও আর্থিক
প্রবাহ, মুদ্রা,
অর্থ প্রদানের
প্লাটফর্ম এবং
পণ্য ও
পরিষেবা বাণিজ্য
বাড়বে।
সময়ের সাথে
সাথে—বিশ্ব
দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী
রাষ্ট্র ও
তাদের মিত্রদের
মধ্যে বিভক্ত
হয়ে পড়বে—একটি
নিয়ন্ত্রিত হবে
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ
ও তাদের
ঘনিষ্ঠ উদীয়মান
গণতান্ত্রিক মিত্র
রাষ্ট্র দ্বারা;
আরেকটি নিয়ন্ত্রিত
হবে চীন
ও কৌশলগত
মিত্র রাশিয়া,
ইরান ও
উত্তর কোরিয়া
দ্বারা। যদিও
চীন নির্দিষ্ট
একটা সময়ের
পর তার
কৌশলগত মিত্র
রাষ্ট্রের ওপরেও
প্রভাব বিস্তার
করবে। পাশাপাশি
তাদের ওপর
নির্ভরশীল উদীয়মান
ও সম্ভাবনাময়
এবং উন্নয়নশীল
অর্থনীতির বাজার
নিয়ন্ত্রণ করবে।
বৈশ্বিক অর্থনীতির
বিভক্তি, পপুলিস্ট
কর্তৃত্ববাদের উত্থানের
ফলে অসম
সমাজ ব্যবস্থা
প্রতিষ্ঠা, কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তার ফলে
সৃষ্ট বেকারত্ব,
ভূ-রাজনৈতিক
সংঘাত বৃদ্ধি
এবং গুরুতর
ও নিয়মিত
মানবসৃষ্ট দুর্যোগের
পাশাপাশি বৈশ্বিক
জলবায়ু পরিবর্তন
এবং জৈবিক
মহামারী (জীবজগতের
বাস্তুসংস্থান ধ্বংসের
ফলে সৃষ্ট
সংকট) বিষয়গুলো
ছাড়াও আসন্ন
দশক হবে
ভঙ্গুরতা, অস্থিরতা
এবং সম্ভবত
দীর্ঘায়িত বিশৃঙ্খলার।
২০২০ সাল
ছিল শুধু
তার শুরু।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
নুরিয়েল রুবিনি: রুবিনি ম্যাক্রো অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান নির্বাহী
ভাষান্তর: মুহাম্মাদ হাসান রাহফি





