বিশ্বজুড়ে নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর বিস্তার ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়—২০২০ সালে বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে বড় দুটি ঘটনা। এর বাইরেও বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল চীন। এর একটি কারণ বিশ্বজুড়ে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলো শুরু থেকেই চীনকে দায়ী করছে। আরেকটি কারণ ২০২০ সালজুড়ে ভূরাজনৈতিক উচ্চাশা পূরণে সচেষ্ট ছিল বেইজিং। বিশেষত ভারতের সাথে রক্তক্ষয়ী সীমান্ত বিরোধ বিদায়ী বছরে পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ এ দুই দেশের মধ্যে ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করেছিল।

বছরের মাঝামাঝিতে লাদাখ সীমান্তে হঠাৎই মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায় চীন-ভারতের সেনারা। ভারতের অভিযোগ, চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি সীমান্ত বরাবর উপস্থিতি বাড়িয়েছে। বিনা উসকানিতে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। ভূমি দখল করেছে। এর জের ধরে সীমান্তে রক্ত ঝরেছে উভয় পক্ষের। চীনও পাল্টা অভিযোগ তুলেছে ভারতের বিরুদ্ধে। যদিও চীন-ভারতের বিরোধ ঐতিহাসিক। আঞ্চলিক রাজনীতিতে বরাবর মুখোমুখি অবস্থানে দেশ দুটি। তথাপি নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিংয়ের উষ্ণ সম্পর্ক এতে ভারসাম্য ধরে রেখেছিল।

গত ছয় বছরে মোদি ১৮ বার চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে দুই নেতার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এর মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লি মূলত বেইজিংয়ের সাথে বন্ধুত্ব জোরদার করার পাশাপাশি চীন-পাকিস্তান বিশেষ মিত্রতার লাগাম টানার চেষ্টা করেছে। কেননা কাশ্মীর সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নিরসন দিল্লির নীতিনির্ধারকরা বরাবর অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছেন। তাদের ভয়, কাশ্মীর ইস্যুতে চীন প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে সমর্থন দিলে তা মোকাবেলা করা ভারতের জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারে, যা কাশ্মীরে ভারতীয় অবস্থানকে দুর্বল করবে।

তবে মোদির পক্ষ থেকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়ার মতো তুলনামূলক নিরাপদ কৌশল যে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে তার প্রমাণ ২০২০ সালে সীমান্ত বিরোধ। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে গিয়ে বরং প্রধানমন্ত্রী মোদি চীনা প্রেসিডেন্টের আগ্রাসী সীমান্ত কৌশলকে উপেক্ষা করে গেছেন, যা দিল্লির জন্য কোনো ভালো ফল বয়ে আনেনি। এক্ষেত্রে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। ১৯৬২ সালের ইন্দো-চীন যুদ্ধে ভারতের অসহায়ত্বের পেছনে তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর চীনের মনোভাব বুঝতে না পারা ও কৌশলগত ব্যর্থতাকে দায়ী করেন অনেকে। তিব্বত নিয়ে মাও সে তুংয়ের কৌশল বুঝতে পুরোপুরি অসফল হয়েছিল নেহরু সরকার, যার ফলাফল সম্মুখযুদ্ধে চীনা সেনাদের কাছে নাস্তানাবুদ হওয়া।

ওই যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি কখনই ভুলতে পারেনি ভারত। চীনের প্রতি আর কখনই তৈরি হয়নি পারস্পরিক বিশ্বাসের সম্পর্ক। ২০২০ সালে দেশটিকে অনেকটা একই কৌশলে শিক্ষা দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা গোপনে সীমান্তে সৈন্য উপস্থিতি বাড়িয়ে, রাস্তাঘাট ও সেনা ছাউনিসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করে, সীমান্তরেখা অতিক্রম করে দিল্লিকে রীতিমতো ভড়কে দিয়েছেন তিনি। দুই পক্ষের প্রকাশ্য বিরোধে জড়ানোর আগে এসব কৌশল ও উদ্যোগের খবর খুব একটা বাইরে আসেনি। ভারতের নজর ছিল মূলত পাকিস্তান সীমান্তের দিকে। অথচ মে-জুনে আঘাত এসেছে লাদাখে, চীন সীমান্তে। এর মধ্য দিয়ে শি জিনপিংয়ের প্রতি মোদির প্রসারিত বন্ধুত্বের হাত কার্যত ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। কৌশলগত বিরোধে এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে গেছেন জিনপিং।

জলে ও স্থলে চীনা উপস্থিতির জুজু বরাবরই ভুগিয়েছে ভারতকে। এ কারণে ভারত মহাসাগরে চীনের বিপরীতে কৌশলগত উপস্থিতি বাড়াতে নৌ-সক্ষমতা জোরদার করেছে দেশটি। শক্তিশালী করা হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র সুরক্ষা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ভারতীয় বহরে যুক্ত হয়েছে সর্বাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র। ভারত এখন হাইপারসনিক ক্রুজ মিসাইলের মালিক। রয়েছে হাউব্রিড মিসাইল টর্পেডো, যা দিয়ে সাবমেরিন ও বিমানবাহী রণতরীতে আঘাত হানা সম্ভব। শত্রুপক্ষের রাডার কিংবা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে সক্ষম অ্যান্টি-রেডিয়েশন ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে ভারত। সমুদ্রপথের নিরাপত্তা জোরদারে ব্যবহার হচ্ছে সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান বহনকারী রণতরী। বিরোধপূর্ণ লাদাখ সীমান্তেও বাড়ানো হয়েছে সেনা টহল। চীনা ভীতি থেকে সর্বোপরি ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যয় বেড়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে দেখা গেছে পাকিস্তান সীমান্তে বাড়তি নজর দিতে গিয়ে সীমান্ত এলাকায় চীনের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির কৌশল নজর এড়িয়ে গেছে দিল্লির। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে শি জিনপিংয়ের এমন আগ্রাসী কৌশল এগিয়ে রেখেছে চীনকে।

অনেক বিশ্লেষক ভেবেছিলেন, পর্বত ঘেরা সীমান্ত ও গহিন সমুদ্রে চীন-ভারতের প্রকাশ্য বিরোধে দাঁতাত হিসেবে কাজ করবে প্রতিরক্ষা ও পারমাণবিক সক্ষমতা। কোনো পক্ষই আগ বাড়িয়ে যুদ্ধে জড়াবে না। সেটা হয়নি, তার প্রমাণ বিদায়ী বছরের রক্তক্ষয়ী সীমান্ত বিরোধ। চীন সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে ভারত। তবে দেশটির পক্ষে দুর্গম এ সীমান্তের সব জায়গায় সমান নজরদারি করা সম্ভব নয়। আর এ সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে চীনের সেনারা।

এ পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, চীনকে এককভাবে মোকাবেলার আশা ছেড়েছেন নরেন্দ্র মোদি। আর তাই তো গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে প্রথমবারের মতো যৌথ নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়েছে ভারত। ভারত মহাসাগরে শি জিনপিংয়ের আগ্রাসী কৌশল ঠেকাতে যে এ মহড়ার আয়োজন, তাতে সন্দেহ নেই। তবে লাগাদ সীমান্ত নিয়ে এখন অনেকটাই নীরব দিল্লির সাউথ ব্লক।

হোয়াইট হাউজে ক্ষমতার পালাবদল আগামী দিনগুলোয় ভারত মহাসাগর ও এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বিরুদ্ধে ইন্দো-মার্কিন মিত্রতা আরো মজবুত করে তুলতে পারে। কেননা এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত দুই দেশেরই বিরোধ চীনের সঙ্গে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনা জুজুর ভীতি দুই দেশকে আরো কাছাকাছি এনেছে। অন্যদিকে ইন্দো-মার্কিন মিত্রতা সমুদ্রপথের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুটে প্রভাব বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের গলার কাঁটা হয়ে রয়েছে।

জোটবদ্ধভাবে চীনকে মোকাবেলা করার পাশাপাশি এককভাবে কূটনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে শি জিনপিংয়ের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে মাথা তুলে রাখতে চায় দিল্লি। শি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ এগিয়ে নিচ্ছেন। এতে বাণিজ্য ও অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামরিকভাবেও লাভবান হবে চীন। তিব্বত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে তত্পর রয়েছে বেইজিং। প্রয়োজনে নয়া উপনিবেশবাদী আচরণ করতে পিছপা হয় না চীন। তবে চীনের এসব কৌশল বাস্তবায়নের পথে ভারত বরাবর বিরোধিতা করে এসেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে যুক্ত হয়নি দেশটি। দালাই লামাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে তিব্বতের চীনবিরোধী নির্বাসিত সরকারকে কৌশলগত সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে দিল্লি। এসবের মধ্য দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে প্রচ্ছন্ন চাপ বজায় রাখতে চায় ভারত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে ভারতের সাথে চীনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সম্পর্ক বিদ্যমান এবং দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যের পাল্লা আগে থেকেই চীনের প্রতি ঝুঁকে রয়েছে। এ পরিস্থিতি যেকোনো বিষয়ে আগ্রাসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কৌশলগতভাবে চীনকে এগিয়ে রাখে। শি জিনপিং এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। তবে ভারত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ভারসাম্য ফেরাতে চায়, যাতে সংকটকালে বাণিজ্য খাতে বড় ধরনের কোনো বিপদে পড়তে না হয়।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই চীন সীমান্ত নিয়ে আগ্রাসী নীতি মেনে চলেছে। দেশটির সঙ্গে গত শতকের ষাটের দশকে ভারত এক দফা যুদ্ধে হেরেছে। সাম্প্রতিক সীমান্ত বিরোধেও ভারত কার্যত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, যা পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। আঞ্চলিক শক্তিসাম্য বজায় রাখার পথে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে মিত্রদের পাশে থাকার কথা বলে এ অঞ্চলের বাইরের শক্তিগুলো ভূমিকা রাখার সুযোগ খুঁজে নিচ্ছে। তবে এর মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বাড়ানোর কৌশলগত উচ্চাশা অনেকটাই পূরণ করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

ব্রহ্ম চেলানি: অধ্যাপক, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ, সেন্টার ফর দ্য পলিসি রিসার্চ, দিল্লি এবং ফেলো, রবার্ট বশ একাডেমি, বার্লিন

ভাষান্তর: অনিন্দ্য সাইমুম ইমন